আসাদুজ্জামান রয়েল, মণিরামপুর
প্রাচীন জেলা যশোর বিভিন্ন কারণে বিখ্যাত। তার মধ্যে খেজুরের রস ও গুড় অন্যতম। প্রবাদ আছে “যশোরের যস খেজুরের রস”। কিন্তু জনসংখ্যার আধিক্য, বন্যা ও সরকারের তদারকির অভাবে হরহামেশা খেজুর গাছ নিধন করায় শত বছরের সেই ঐতিহ্য এখন হারাতে বসেছে। যশোর জেলার আটটি উপজেলাতেই কম-বেশি খেজুর গুড় উৎপাদন হয়।
এক্ষেত্রে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা মণিরামপুরে রস ও গুড় উৎপাদনে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তবে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে দিনে দিনে যত্রতত্র খেজুর গাছ নিধনের ফলে রস ও গুড় উৎপাদন এখন হুমকির মুখে।
একদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে পতিত জমি যেখানে খেজুর গাছের বাগান ছিল সেখানে এখন মানুষের বসতি গড়ে উঠছে। এছাড়া ইট ভাটার আগ্রাসন ছাড়াও মনিরামপুরের ভবদহ এলাকার জলবদ্ধতার কারণেও খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা। সচেতন মহলের ধারণা সরকারিভাবে এখনই খেজুর গাছ রক্ষায় ব্যবস্থা না নিলে বিলুপ্ত হতে পারে যশোরের এ ঐতিহ্য। এদিকে গুড় উপাদনে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা না পেয়ে গাছিদের মধ্যে অনেকে তাদের পেশা বদল করছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদা আকতার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মণিরামপুর বিশেষ করে ভবদহ অঞ্চলে প্লাবিত এলাকায় খেজুর গাছ নেই বললেই চলে। মণিরামপুর সরকারি কলেজের অধ্যাপক ও পরিবেশের উপর অভিজ্ঞ নুরুল ইসলাম বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে যেসব পতিত জমিতে খেজুর গাছের বাগান ছিলো সেখানে মানুষ বাড়ি-ঘর তৈরির কারণে গাছের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। হানুয়ার গ্রামের কৃষক সেলিম রেজা বলেন, আগে চাষি জমিতেও খেজুর গাছ ছিল এখন আর সেই অবস্থা নেই। গ্রামের রাস্তার দুই ধার দিয়ে কেউ কেউ খেজুর গাছ লাগানোর ফলে তা’ কোন রকমে টিকে আছে।
উপজেলা কৃষিসম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, মনিরামপুরে ১শ’ ৯৭ হেক্টর জমিতে বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা এক লাখ ৬১ হাজার, ২শ’ ১৯টি। এর মধ্যে রস আহরণযোগ্য গাছের সংখ্যা ৬৪ হাজার ৫শ’ ৮৫টি। গড়ে প্রতি গাছ থেকে রস আহরিত হয় প্রতি মৌসুমে ৬০ লিটার। প্রতি হেক্টরে গুড় উৎপাদন হয় চার হাজার ৩শ’ ২৬ কেজি। অর্থাৎ মণিরামপুরে মৌসুমে উৎপাদিত গুড়ের মূল্য প্রায় সাত কোটি ৩৮ লাখ টাকা। উপজেলায় এসব গাছ থেকে রস আহরণের জন্যে গাছি রয়েছেন এক হাজার ১শ’ ৯২ জন। উপজেলার হেলাঞ্চী গ্রামের গাছি আমিনুর রহমান বলেন, আজ থেকে ২০-২৫ বছর আগের আমাদের কয়েক পোন (৮০ টিতে এক পোন) খেজুর গাছ ছিল কিন্তু বিভিন্ন কারণে এখন আর এতগুলো খেজুর গাছ নেই। তিনি এ মৌসুমে তিন কুড়ি (৬০)টি খেজুর গাছ থেকে রস ও গুড় উৎপাদন করছেন।
এখন রস ও গুড়ের দাম তুলনামুলক বেশি হলেও তেমন লাভ হয় না। কারন শ্রমিকের মূল্য বেশি, রস থেকে গুড় উৎপাদন করতে যে জ্বালানি লাগে তার সংকট রয়েছে। তবে বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখতে এ পেশা ছেড়েও দিতে পারিনা বলে জানান তিনি। তিনি জানান, উৎপাদিত গুড় ভেজালমুক্ত তাই শহর থেকে লোকজন অপেক্ষা করেও হলেও তার কাছ থেকে গুড় ও পাটালী কিনে নিয়ে যান। আর এতেই তিনি ও তার পরিবার অনেক খুশি । তিনি আরো বলেন, তেমন আয়-রোজগার না হওয়ায় অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

