হিমেল খান
বাল্যবিবাহের খবর পেয়ে অভিযান চালান প্রশাসন। বন্ধ করা হয় বিয়ের আযোজন। কিন্তু এরপর কী হচ্ছে সেই পরিবারে,বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছেন কি অভিভাবকরা, কিংবা অন্য কোথাও নিয়ে আবারও বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত দেখার সুযোগ নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের। জনবল সংকটে প্রতিরোধের পর নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
যশোরে বাল্যবিয়ে ঠেকাতে মাঠপর্যায়ে কাজ করা কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এমন চিত্র। গত পাঁচ বছরে জেলায় ১৭০টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হলেও এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে স্থায়ী ও সমন্বিত ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এ কারনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে বাল্যবিবাহ রোধ হলেও কার্যত প্রতিকার হচ্ছে না। সাময়িক দৃষ্টিতে বিয়ে বন্ধ হলেও, অন্য সময়ে কিংবা অন্য স্থানে গিয়ে পূণরায় ওই বিবাহ দেয়া হচ্ছে।
যশোর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী,২০২২ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যশোরে ১৭০টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৩৭টি, ২০২৩ সালে ৩৩টি, ২০২৪ সালে ৩১টি, ২০২৫ সালে ৩৮টি এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩১টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়। প্রতিরোধ করা বিয়েগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েদের বয়স ছিল ১৬ বছরের নিচে।
এই পরিসংখ্যান বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা বিয়ের হিসাব। তবে কতটি বাল্যবিয়ে প্রশাসনের নজরের বাইরে থেকে যাচ্ছে, কতটি পরিবার বিয়ে বন্ধের পর আবার উদ্যোগ নিচ্ছে, কিংবা কত কিশোরীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিরোধের সংখ্যা দিয়ে জেলায় বাল্যবিয়ের প্রকৃত প্রবণতা নির্ধারণের সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
গ্রামেই বেশি ঝুঁকি :
যশোরের গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিয়ের ঝুঁকি বেশি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরই মেয়েদের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অভিভাবকেরা। দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, স্কুল-কলেজে যাতায়াতের পথে উত্ত্যক্ত হওয়ার আশঙ্কা এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
একাধিক কিশোরীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কেউ কেউ উচ্চশিক্ষা অর্জনের স্বপ্ন দেখলেও পরিবারের সিদ্ধান্তের কারণে অল্প বয়সেই বিয়ের পিড়িতে বসতে হচ্ছে। এতে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি শৈশব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
যশোর সরকারি এমএম কলেজের সাবেক অধ্যাপক ছোলজার রহমান বলেন, অভিভাবকেরাই অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেন। ধর্মীয় শিক্ষার ভুল ব্যাখ্যা, দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং কার্যকর সরকারি নীতির ঘাটতি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। অল্প বয়সে বিয়ের কারণে কিশোরীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। মা ও শিশুর জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সমাজকর্মী নবনিতা সাহা বলেন, বাল্যবিয়ের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট কিশোরীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। যশোর সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় নারী ও শিশু পাচারের ঝুঁকির বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। অধিকাংশ পুরুষই একাধীক বিবাহ করে পাচার করছে নারীদের।
জনপ্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় উদ্যোগে ঘাটতি :
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ,অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সামাজিকভাবে চাপ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যশোরের আটটি উপজেলার ৯৩টি ইউনিয়ন পরিষদে বর্তমানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহি কমে এসেছে।
প্রশাসনিকভাবে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম চললেও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, পারিবারিক বিরোধের প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপ এবং সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনতামূলক কার্যক্রম ধারাবাহিক না হলে এবং পরিবারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ না থাকলে একবার অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা কঠিন।
স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী এক জনপ্রতিনিধি বলেন, বাল্যবিয়ে বন্ধে সচেতনতা তৈরির জন্য আলাদা বাজেট নেই। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী, কোথাও বাল্যবিয়ের খবর পেলে দ্রুত গিয়ে তা বন্ধের চেষ্টা করা হয়।
অভিযান আছে, ফলোআপ নেই :
যশোর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক অনিতা মল্লিক বলেন, বাল্যবিয়ের তথ্য পেলে তারা অভিযান চালিয়ে তা প্রতিরোধ করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় একবার বিয়ে বন্ধ করার পর সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারি করা সম্ভব হয় না।
তিনি জানান, অনেক ক্ষেত্রে এক জায়গায় বিয়ের আয়োজন বন্ধ করার পর পরিবার অন্য স্থানে নিয়ে বিয়ের উদ্যোগ নেয়। আবার কোথাও অসাধু কাজির সহযোগিতায় গাড়ির মধ্যেও বিয়ে সম্পন্ন করা হয়। এতে প্রতিরোধ কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থাৎ, কোনো বিয়ের আয়োজন বন্ধ করা গেলেও সংশ্লিষ্ট কিশোরীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার সুযোগ সীমিত। বিয়ে বন্ধের পর পরিবারকে সচেতন করা, মেয়েটির পড়াশোনা অব্যাহত রাখা এবং পুনরায় বিয়ের উদ্যোগ ঠেকাতে নিয়মিত যোগাযোগ প্রয়োজন। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে এ ধরনের ধারাবাহিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
যশোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার হক বলেন, অভিভাবকদের অসচেতনতা বাল্যবিয়ের অন্যতম প্রধান কারণ। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সমাজসেবা ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। খবর পেলেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে বিয়ে বন্ধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে উঠান বৈঠকের মাধ্যমে অভিভাবকদের সচেতন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রয়োজন প্রতিরোধের পরও দায়িত্ব :
প্রতিরোধ করা প্রতিটি বিয়ের তথ্য সংরক্ষণ, সংশ্লিষ্ট পরিবারের নিয়মিত খোঁজখবর, কিশোরীদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা এবং পুনরায় বিয়ের উদ্যোগ শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়ে সামাজিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
সচেতন নাগরিকদের মতে, বাল্যবিয়ে বন্ধে প্রচলিত আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি মেয়েদের শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারগুলোকে শুধু আইনের ভয় দেখিয়ে নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েও সচেতন করতে হবে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
যশোরে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্য মতে গত পাঁচ বছরে ১৭০টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা হলেও, প্রতিরোধের পর নজরদারি না থাকাই একই পরিবারে আবার বিয়ের উদ্যোগ নিচ্ছে কি না, তা অজানাই থেকে যাচ্ছে। তাই বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে জনবল বৃদ্ধি, নিয়মিত ফলোআপ এবং পরিবারকেন্দ্রিক কার্যক্রম নিশ্চিত করাই এখন প্রধান লক্ষ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে,যশোর মেডিকেল কলেজের স্ত্রী রোগ প্রসুতিবিদ্যা ও বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. তানজিলা ইয়াসমিন বলেন, এডোলেসেন্ট মাদার বা কিশোরী মা বলতে সাধারণত ১৯ বছর বা তার কম বয়সী মেয়েদের বোঝায়। ইম্যাচিউরড এমন মায়েরা কখনোই মানসিকভাবে দুর্বল থাকে।
বিধায় ডেলিভারি অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে। প্রসবের সময় রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেশি থাকে, বাচ্চা নষ্ট হয়ে যাবার আশংকাও থাকে। এছাড়া জন্ম নেয়া শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, বুদ্ধিবৃত্তিক বা শারীরিক বিকাশে ধীরগতির প্রবণতা বা শারীরিক বিকাশে ধীরগতির প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কিশোরি মা নানা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে যায়।
