বাংলার ভোর প্রতিবেদক
নির্বাচনের পর যশোর জেলায় প্রথম মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ প্রবণতা এবং ঈদকে সামনে রেখে নিরাপত্তা জোরদারের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়।
সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে জেলার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথাও জানান তিনি।
জেলার মাসিক অপরাধ চিত্রে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি মাসে জেলায় ১টি ডাকাতি, ৪টি খুন, ২টি দাঙ্গাসহ খুন, ৪টি ধর্ষণ, ১টি মানবপাচার, ৪টি সড়ক দুর্ঘটনা, অস্ত্র আইনে ৮টি এবং মাদকদ্রব্য আইনে ৬৫টিসহ মোট ১৯৩টি মামলা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ আক্রান্ত, চুরি ও চোরাচালানের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
অপরদিকে, জানুয়ারি মাসে জেলায় ৯টি খুন, ২টি ধর্ষণ, ২টি মানবপাচার ও ৯টি সড়ক দুর্ঘটনাসহ সর্বমোট ২২৯টি মামলা হয়েছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানুয়ারি মাসের তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে অপরাধ প্রবণতা কিছুটা কমেছে বলে সভায় জানানো হয়।
সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, যশোর পৌরসভার মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এতে চুরি ও ছিনতাই প্রতিরোধে সহায়তা মিলবে। তিনি বলেন, যশোর শহর অন্ধকার থাকবে না। ইতোমধ্যে কয়েকটি ওয়ার্ডে লাইট স্থাপন করা হয়েছে। চেম্বার অব কমার্স, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগ যৌথভাবে ক্যামেরা স্থাপনের কাজ বাস্তবায়ন করবে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের ১৮০ দিনের একটি কর্মসূচির আওতায় মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে চুরি, ছিনতাই ও পেট্রোল পাম্প সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিষয়েও প্রশাসন কাজ করছে। দলমত নির্বিশেষে সবাই সহযোগিতা করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মাটি কাটার ট্রাক জব্দের বিষয়েও প্রশাসনের কোনো বাধা নেই উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, বিদ্যুতের ব্যবহার কমিয়ে দোকানপাট রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঈদের আগ পর্যন্ত পুলিশি টহল বাড়ানো হবে। সন্ধ্যার পর নগদ টাকায় কেনাবেচা বেশি হওয়ায় নিরাপত্তা জোরদার করা হবে।
তিনি জানান, রাস্তার পাশে বালি, ইট, খোয়া বা কাঠ রাখলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা সরিয়ে নিতে হবে। সময়মতো সরানো না হলে প্রশাসন তা জব্দ করবে। রাস্তা ক্লিয়ার রাখতে অভিযান পরিচালনা করা হবে। প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক নিলামও করা হতে পারে। বিশেষ বিবেচনায় রাস্তার পাশে থাকা অস্থায়ী দোকানপাট সরাতে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
এদিকে জলমহল ইজারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জলমহলের মূল উদ্দেশ্য রাজস্ব আদায় নয়; প্রকৃত মৎস্যজীবীরা যেন জলমহল পায় সেটিই প্রধান বিষয়। নীতিমালা অনুযায়ী আবেদনকারীদের মধ্য থেকে স্থানীয় প্রকৃত চাষিরা কম দামে হলেও জলমহল বরাদ্দ পাবে।
সভায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার বলেন, শহরে প্রবেশ ও বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ৪৭টি পয়েন্ট এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডে সিসিটিভি কভারেজ দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ক্যামেরা স্থাপনের পর সেগুলো নিয়মিত তদারকির জন্য লোক নিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। নইলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে স্থাপন করা ক্যামেরা সচল রাখা কঠিন হবে।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা দোকানে থাকলে ক্যামেরা চালু থাকে। কিন্তু দোকান বন্ধ হলে ক্যামেরা বন্ধ থাকে বা সঠিকভাবে কাজ করে না। ব্যবসায়ীদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান তিনি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরও বলেন, যশোর সারা দেশের মধ্যে ফেনসিডিল পাচারের একটি বড় রুট। বর্তমানে ফেনসিডিলের পরিবর্তে কোরেক্স বাজারে এসেছে। পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালিয়ে তা জব্দ করছে। গত এক মাসে কোতোয়ালি থানা এলাকায় ৪০ জন মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি জানান, দুই বছরের বেশি সময় একই ক্যাম্প বা ফাঁড়িতে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের বদলি করা হবে। ঈদের সময় অজ্ঞান পার্টি ও জাল টাকার তৎপরতা বাড়ে বলেও সতর্ক করেন তিনি। ব্যবসায়ীদের নগদ টাকা পরিবহনের ক্ষেত্রে পুলিশের সহযোগিতা নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, ১৫ রোজার পর থেকে শহরের ১৪টি পয়েন্টে ১৪টি টহল টিম পায়ে হেঁটে টহল দিচ্ছে। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল এবং ঈদের পর এ বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সভায় স্বর্ণের বার দেখিয়ে প্রতারণার ঘটনাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। এছাড়া রাত ১২টার আগে শহরের মধ্যে বাস ও ট্রাক প্রবেশ বন্ধ রাখার বিষয়েও কাজ করা হবে।
অভয়নগরে বুলেট ফারাজি ও গুলজার নদীর ওপারে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছিল বলে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের আটক করা হয়েছে। পুলিশের খোয়া যাওয়া অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। মণিরামপুরে রানা প্রতাপ হত্যা মামলায় সেই অস্ত্র ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে।
ঈদের সময় অনেকেই বাড়ি ফাঁকা রেখে বাইরে যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেক্ষেত্রে মূল্যবান স্বর্ণালংকার ও টাকা নিরাপদ স্থানে রেখে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।
সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ও যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, পুলিশ বিভাগ থেকে তালিকা পাওয়ার পর পৌরসভা সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু করবে। তালিকা পাওয়ার ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে এসব ক্যামেরা মনিটরিং করা হবে। আগে স্থাপন করা অনেক ক্যামেরা রয়েছে, সেগুলোর কিছু সংস্কারও করা হবে।
সভায় জেলা বিএনপির সভাপতি ও পিপি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, ঈদের আগে দ্রব্যমূল্য সাধারণত বেড়ে যায় এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। বিশেষ করে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বাড়ে। শহরে হঠাৎ সোনা বিক্রির নামে প্রতারণার একটি নতুন কৌশলও দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, মামলার ফরওয়ার্ডিং সংক্রান্ত কিছু সমস্যার কারণে অনেক সময় দাগি আসামিরা জামিন পেয়ে যায়। কিশোরদের কাছেও অস্ত্র পাওয়া যাচ্ছে, যা উদ্বেগজনক। ঈদের আগে শহরে যানজট বাড়ছে এবং বড় যানবাহন ঢোকার বিষয়েও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
এছাড়া অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন ব্যবহার করে কিছু চালক বাজারের মালামাল পরিবহন করছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, হাট-বাজার ইজারার ক্ষেত্রে স্থানীয় গ্রুপিংয়ের কারণে সরকার ন্যায্য রাজস্ব পাচ্ছে না। অতিরিক্ত ইজিবাইক রাস্তায় নামছে এবং অনেক সরকারি চাকরিজীবীও একাধিক গাড়ি চালাচ্ছেন। তাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, অতীত সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত। বিএনপির কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকলে প্রশাসন যেন কঠোর ব্যবস্থা নেয়।
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ফাঁড়ি ও ক্যাম্পের পুলিশ সদস্য সালিশ-বিচারের নামে চাঁদাবাজি করছে। বিশেষ করে চাঁচড়া ফাঁড়ির আইসি মামুন এ ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধের বিষয়ে অনেক ব্যবসায়ী অসন্তোষ প্রকাশ করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত না এলে বিষয়টি বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাধারণ সম্পাদক তানভীরুল ইসলাম সোহান বলেন, ব্যবসায়ীরা যতটা সম্ভব দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করবেন। চেম্বারের সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে অপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রিক লাইট ও সাজসজ্জা বন্ধ রাখা হবে।
তিনি বলেন, এটি কারো ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়নি। ২৫ রোজার পর থেকে ব্যবসায়ী সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করা হবে। দ্রব্যমূল্যের কিছুটা বৃদ্ধি জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সভায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইরুফা সুলতানা, সিভিল সার্জন মাসুদ রানাসহ সেনাবাহিনী ও বিজিবির প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান ও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

