সুমন ব্রহ্ম, ডুমুরিয়া :
বর্তমান মৌসুমের শুরুতেই অনাবৃষ্টি তীব্র তাপদাহে পানি সংকটের কারণে দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তা ভর করেছে ডুমুরিয়ায় উপজেলার চিংড়ি ঘেরের মালিক ও সবজিচাষীদের। সার্বক্ষণিক তদারকিতেও চিংড়ি মাছ বাঁচাতে পারছেন না চাষীরা। পানির অভাবে শুকিয়ে মরে যাচ্ছে সবজি ক্ষেত। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, বৃষ্টি না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। যতটুকু সম্ভব চাষিদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তারা।
উপজেলা কৃষি দপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছর ৫ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। উৎপাদন ছিল ১ লাখ ১২ হাজার টন। উৎপাদিত সবজি ১৭৬ কোটি টাকা বিক্রি হয়েছে। এবার একই জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সংশয় রয়েছে কৃষি বিভাগের।
উপজেলার সাহস গ্রামের কৃষক সৈয়েদ সাইফুর রহমান জানান, দেড় বিঘা জমিতে বেগুনসহ অন্যান্য সবজি আবাদ করেছেন। গত বছর এই সময় খরচ বাদে চার লাখ টাকার বেগুনসহ অন্যান্য সবজি বিক্রি করেছিলেন। একই সময় মাত্র এক লাখ টাকার সবজি বিক্রি হয়েছে তার। তিনি বলেন, পানির অভাবে সবজির ক্ষেতে সমস্যা হচ্ছে। গাছগুলো মারা যাচ্ছে।
খর্নিয়া গ্রামের আবুল কাশেম এক বিঘা ও বিকাশ মন্ডল দুই বিঘা জমিতে এখনো চাষাবাদ শুরু করতে পারেননি। গত বছর সবজি বিক্রি করে ভাল লাভ করেছিলেন তারা। এই দুই চাষি পানির সংকটকে দায়ি করে এবার চাষের আশাই ছেড়ে দিয়েছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাজমুল হুদা বলেন, চলতি মৌসুমে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তবে এখন খালবিলে কোথাও পানি নেই। অনাবৃষ্টির কারণে চাষিদের বিপাকে পড়তে হচ্ছে। মারা যাচ্ছে ঘেরের চিংড়ি। চলতি মৌসুমে জ্যৈষ্ঠ্য মাসের শেষের দিকেও দেখা নেই বৃষ্টির। এতে বিপাকে পড়েছেন মৎস্য ও সবজি চাষীরা।
উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে গত মৌসুমে ১১ হাজার ১৪৬ হেক্টর ঘেরে ৭ হাজার ৫৭৮ টন গলদা উৎপাদন হয়েছে। বিক্রি হয়েছে ৬০৬ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ৬ হাজার ৬৮১ হেক্টর ঘেরে উৎপাদিত ২ হাজার ৬১২ টন বাগদা বিক্রি হয়েছে ২৩৫ কোটি ৮ লাখ টাকা। এ ছাড়া হরিণা (ছোট চিংড়ি) ১৪ কোটি ৫০ লাখ, কার্প জাতীয় সাদা মাছ ৪০৫ কোটি ৫০ লাখ ও অন্যান্য মাছ ৭৫ কোটি টাকার বিক্রি হয়েছে।
চলতি মৌসুমে মাছ চাষ হয়েছে মোট ২২ হাজার ১৪৪ হেক্টর জমিতে। বাগদা ৬ হাজার ৭৮১ হেক্টর, গলদা ১১ হাজার ১৪৬ হেক্টরও ৪ হাজার ২৫৭ হেক্টর জমিতে কার্পসহ অন্য মাছ চাষ হচ্ছে। চাষিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাপদাহের কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার ঘেরের গলদা, বাগদা ও কার্প জাতীয় মাছ মারা গেছে। এতে মাছ চাষিদের প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
চুকনগর গ্রামের মিজানুর রহমান আরশনগর বিলে ৩৬ বিঘা জমিতে চিংড়ি ঘের রয়েছে। সেখানে ৪০ হাজার বাগদা পোনা ছেড়েছিলেন। মিজানুর রহমান বলেন, প্রচণ্ড তাপদাহে পানি সংকট দেখা দিয়েছে। এতে পাঁচ লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে।
৪০ বিঘা ঘেরে এক লাখ বগদা চিংড়ি পোনা মারা গেছে উপজেলা ছোট মুড়াবুনিয়ায় প্রশান্ত কুমার ঘোষের। এতে তার ক্ষতি হয়েছে দশ লক্ষাধিক টাকার।
ডুমুরিয়া গ্রামের মাছ চাষি নুরুল ইসলমের ৯ বিঘার ঘেরটি শোভনা ইউনিয়নের কাকমারি গ্রাম এলাকায়। তিনি বলেন, এ বছর মাছ মারা যাওয়ায় চাষিদের ক্ষতি হচ্ছে ভয়াবহ পরিমাণে। একই ইউনিয়নের কাঁটাখালী গ্রামের হাবিবুর রহমান, হেকমত আলী শেখ, হাফিজুর রহমান ও মনিলাল বিশ্বাসের ভাষ্য, তাপদাহ থেকে মাছ রক্ষায় ঘেরের পানির ওপর মাচা বানিয়ে আশ্রয়স্থল তৈরি করেছেন। তবুও মাছ বাঁচানো যাচ্ছে না। তবে এ সকল মাছ চাষিরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে চেনেন না বলে জানান।
ভাইরাসমুক্ত রেণুর দিকে এবার চাষীরা ঝুঁকেছিলেন। দেশীয় হ্যাচারির পাশাপাশি ভারত থেকেও রেণু সংগ্রহ করেন তারা। এসব তথ্য জানিয়ে আটলিয়া ইউনিয়নের কাঁঠালতলা গ্রামের প্রকাশ কুমার বিশ্বাস বলেন, প্রতি হাজার রেণুর জন্য তাদের গুণতে হয়েছে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। দেশীয় চিংড়ির জন্য যে খাবার দেয়া হয়, তা আবার ভারত থেকে আনা চিংড়ির উপযুক্ত নয়। ফলে ভিন্ন ভিন্ন খাবার চড়া দামে কিনতে হয়। বেশির ভাগ চাষিই ঘেরের জন্য এনজিও বা সুদে টাকা নিয়েছেন।
গরমের কারণে খালবিলে পানি নেই। মাছ মারা যাচ্ছে। ফলে এবার তারা ঋণের ফাঁদে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন।
উপজেলা জেষ্ঠ্য মৎস্য কর্মকর্তা সোহেল মো. জিল্লুর রহমান রিগান বলেন, তাপদাহের সময় মাছের খামারে অন্তত তিন ফুট পানি থাকা বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় পানির তাপ বেড়ে অক্সিজেন সংকটের কারণে মাছ মারা যেতে পারে। তবে তার কাছে চাষিদের ক্ষতির পরিমাণ জানা নেই। এই কর্মকর্তা আরো জানান, এবার ১১ হাজার টন মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল উপজেলায়। এসব মাছ বিক্রি করে ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা আয় হতো। তবে পানি সংকটে ঘেরের মাছ মারা গেলে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

