এসএ কে শামছুদ্দীন জ্যোতি :
বাবা, তুমি কেমন আছো ওই ছোট্ট মাটির ঘরে? হঠাৎ এক অজানা ঝড়ে তোমাকে হারিয়ে আমি যে কতটা নিঃস্ব হয়ে গেছি, তা হয়তো তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। ভালোবাসি বাবা, ভীষণ ভালোবাসি। তোমার কথা মনে পড়লেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হাহাকার করে ওঠে। কতদিন তোমাকে দেখি না! কতদিন তোমার কণ্ঠে নিজের নামটি শুনিনা!
তোমার চশমাটা এখনো আছে, আছে সেই চিরচেনা লাঠি আর পাঞ্জাবি। ঘরের প্রতিটি জিনিস যেন তোমার অস্তিত্বের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু তুমি নেই। অথচ প্রতিটি মুহূর্তে তোমাকেই খুঁজি। কখনো মনে হয়, এই বুঝি তুমি ঘরে ফিরলে। এই বুঝি আগের মতো কোনো কথা বলবে, কোনো প্রয়োজনে ডাকবে। কিন্তু না, তুমি আর ফিরবে না। এই নির্মম সত্যটিই আজও মেনে নিতে পারি না।
তুমি প্রায়ই বলতে, ছেলে আমার বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। বাবা, আমি তোমাকে বলতে চাই, আমি ভালো আছি। তোমার দোয়ার বরকতে, মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে তোমার দেখা স্বপ্নগুলো বাস্তবে রূপ দেয়ার পথে আজ আমি কিছুটা হলেও এগিয়ে যেতে পেরেছি। তোমার যে স্বপ্ন, যে আকাঙ্ক্ষা, যে ভালোবাসা আমাকে ঘিরে ছিল, তার কিছুটা পূরণের চেষ্টা করছি। শুধু তুমি দেখে যেতে পারলে না। জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলো যখন সামনে আসছে, তখনই সবচেয়ে বেশি অনুভব করছি তোমার অনুপস্থিতি।
বাবা, তোমার চশমা, লাঠি কিংবা পাঞ্জাবি দেখলে আজও মনে হয়, তুমি বুঝি আশপাশেই কোথাও আছো। অথচ তুমি চলে গেছ সেই গহিন অন্ধকারে, যেখান থেকে আর কোনো দিন ফিরে আসা যায় না। জানি না, কেমন আছো তুমি। জানার কোনো উপায়ও নেই। শুধু মহান রবের কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন তোমাকে ভালো রাখেন, শান্তিতে রাখেন।
সেদিনের কথা আজও মনে পড়ে, যেদিন তুমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলে। সেদিনই প্রথম বুঝতে পেরেছিলাম, আমার জীবনে তুমি কতটা জুড়ে ছিলে। অথচ তুমি অসুস্থ হয়ে ঘরে পড়ে থাকলেও আমি ছিলাম নিশ্চিন্ত। পকেটে টাকা না থাকলেও কোনো ভয় ছিল না, কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। কারণ আমার যে তুমি ছিলে। আমি জানতাম, পৃথিবীর সব বিপদে-আপদে তুমি আছো। মাথার ওপর তোমার ছায়া আছে। সেই ছায়াটুকুই ছিল আমার সবচেয়ে বড় সাহস, সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।
আজ বুঝি, মানুষ শুধু অর্থ-সম্পদে নিঃস্ব হয় না, প্রিয়জন হারিয়েও নিঃস্ব হয়। আজ আমার পকেটে যা-ই থাকুক, জীবনের কোনো বিপদে পড়লে নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। কারণ সেই বিপদে নির্ভর করার মানুষটি আর নেই। তোমাকে হারানোর পর বুঝেছি, বাবার উপস্থিতি কত বড় আশ্রয়, কত বড় শক্তি।
তোমার কিছু স্বপ্ন ছিল, যা তুমি কখনো প্রকাশ্যে কাউকে বলতে না। হাতে গোনা দু-একজনকে হয়তো তার আভাস দিয়েছিলে। তোমার সেই স্বপ্নের একটি ছিল, পৃথিবীর বুকে তোমার প্রিয় জায়গা নিউমার্কেটে নিজের একটি ঠিকানা তৈরি করা। তোমার সেই স্বপ্ন, তোমার পত্রিকা, তোমার ভালোবাসার প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে আমারও কত পরিকল্পনা, কত স্বপ্ন। আল্লাহর অশেষ রহমতে আজ সেসব স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছি। কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে একটা অভাব আমাকে তাড়া করে ফেরে। তুমি নেই!
বাবা, তোমার স্বপ্নের সেই ঠিকানায় যখন নিজের পরিচয় খুঁজে পাই, তখন আনন্দের চেয়ে কষ্টই বেশি অনুভব করি। মনে হয়, তুমি যদি একবার দেখতে! যদি একবার বলতে, ‘বাবা, তুমি পেরেছ।’ এই একটি বাক্য শোনার জন্য আজও আমার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে থাকে।
আমি বিশ্বাস করি, তুমি দূর আকাশ থেকে আমাকে দেখছ। তোমার ভালোবাসা আর দোয়া এখনো আমাকে আগলে রেখেছে। নইলে এত প্রতিকূলতার মধ্যে এতদূর এগিয়ে যাওয়ার শক্তি আমি কোথায় পেতাম? যে মানুষটি একদিন তোমার ছায়ায় নিশ্চিন্তে পথ চলত, সেই মানুষটিই আজ তোমার স্বপ্নকে বুকে নিয়ে পথ চলার সাহস খুঁজে পায়। তোমার রেখে যাওয়া ভালোবাসাই আমার শক্তি, তোমার স্মৃতিই আমার প্রেরণা।
কখনো কখনো খুব অভিমান হয় বাবা। কেন এত তাড়াতাড়ি চলে গেলে? পৃথিবীতে কত মানুষের বাবাকে তো এখনো পাশে দেখি। তাঁরা বাবার হাত ধরে হাঁটেন, বাবার সঙ্গে গল্প করেন, কোনো বিপদে বাবার কাছে ছুটে যান। শুধু আমার বেলাতেই কেন এমন হলো? কেন আমার সব চাওয়া-পাওয়ার ভিড়ে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মানুষটিই নেই?
মনে পড়ে, অসুস্থ অবস্থায় তুমি যখন ঘরে থাকতে, বাইরে থেকে ফিরেই সবার আগে তোমার কাছে ছুটে যেতাম। মনে হতো, তুমি আছো বলেই আমার পৃথিবীটা পূর্ণ। অথচ একদিন তোমাকে মাটির ঘরে রেখে আসতে হলো। তোমার ভাইকে সঙ্গে নিয়ে তোমার শেষ ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে যখন ফিরলাম, তখন বুঝিনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতাটুকু নিয়েই ফিরছি। তুমি চলে গেলে, আর আমার জন্য রেখে গেলে তোমার অফুরন্ত আশীর্বাদ, ভালোবাসা আর একরাশ স্মৃতি।
তোমার সেই আদরের ছেলে আজও তোমার কাছেই ঋণী। তুমি আমাকে কখনো হিসাব করে ভালোবাসোনি। আমার অন্যায় আবদার, অযৌক্তিক জেদ, কত ভুল-ত্রুটি—সবকিছুই হাসিমুখে মেনে নিয়েছ। আমি কী চাই, তা তোমাকে কখনো বলতে হয়নি। তুমি এমনিতেই বুঝে যেতে। আমার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারতে মনের ভেতর কী চলছে। আজ কত কথা জমে থাকে, কত আবদার করতে ইচ্ছে করে, কত কিছু বলতে মন চায়। কিন্তু বলার মানুষটি যে আর নেই!
তুমি যে দায়িত্বগুলো আমার কাঁধে রেখে গিয়েছিলে, তার কতটুকু পালন করতে পেরেছি জানি না। হয়তো তোমার প্রত্যাশার অনেক কিছুই পূরণ করতে পারিনি। তবুও মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে তোমার রেখে যাওয়া ছোট্ট পরিবারটিকে আগলে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। দিনগুলো কেটে যাচ্ছে, জীবন এগিয়ে যাচ্ছে। মা আজ অসুস্থ। তবুও যতটা সম্ভব শান্তিতে রাখার চেষ্টা করি। আর্থিক অনটন আছে, নানা সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু তোমার পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টায় কোনো কমতি রাখতে চাই না।
তোমার জিশান বড় হয়েছে, তোমার তাহমিদও বড় হচ্ছে। ওদের নিজস্ব একটা পৃথিবী তৈরি হচ্ছে। পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ওরা ব্যস্ত। জানি না, ওরা কে কী হবে, জীবনের কোন পথে এগিয়ে যাবে। তবে আমার একটাই চাওয়া, ওরা যেন ভালো থাকে, মানুষের মতো মানুষ হয়। ওদের মুখে যেন হাসি থাকে। আমার সামর্থ্য যতটুকুই হোক, সেই চেষ্টাটুকু করে যেতে চাই। কারণ আমি জানি, তুমিও ঠিক এটাই চাইতে। তোমার পরিবারের মানুষগুলো যেন ভালো থাকে, এটাই ছিল তোমার সবচেয়ে বড় চাওয়া।
বাবা, আজ তেরটি বছর পূর্ণ হলো তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেছ। সময়ের হিসাবে এগারো বছর হয়তো অনেক দীর্ঘ। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, এই তো সেদিন তুমি ছিলে। এই তো সেদিন তোমার সঙ্গে কথা বলেছি, তোমার কাছে ছুটে গেছি, তোমার পাশে বসে সময় কাটিয়েছি। অথচ তের বছর ধরে তোমার মুখটি ছুঁয়ে দেখা হয়নি। তোমার হাতটি ধরে বলা হয়নি, বাবা, তোমাকে খুব ভালোবাসি।
প্রতিটি শুক্রবারে জুমার নামাজ শেষ করেই তোমার সেই ছোট্ট মাটির ঘরটির কাছে ছুটে যাই। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি। তোমার কবরের পাশে নীরবে কত কথা বলি। হয়তো তুমি শুনতে পাও না, হয়তো আমার কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে যায়। তবুও মনে হয়, তোমার কাছে না গেলে আমার সপ্তাহটাই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মহান আল্লাহর কাছে হাত তুলে শুধু এটুকুই চাই, তিনি যেন তোমাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন।
বাবা, তুমি আমাকে অনেক কিছু দিয়ে গেছ। মাথার ওপর ছায়া, বুকভরা ভালোবাসা, জীবনের পথচলার শিক্ষা, স্বপ্ন দেখার সাহস। তুমি শিখিয়েছ কীভাবে পরিবারকে ভালোবাসতে হয়, কীভাবে নিজের কষ্ট আড়াল করে প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটাতে হয়। শুধু তোমার জীবদ্দশায় তোমার জন্য কিছুই করতে পারিনি। এই আক্ষেপটুকু হয়তো কোনো দিন ঘুচবে না।
আজ আমার অনেক কিছুই আছে, অনেক স্বপ্ন পূরণের পথে। তোমার সেই প্রিয় পত্রিকা, তোমার স্বপ্নের ঠিকানা, তোমার রেখে যাওয়া পরিবারের দায়িত্ব-সবকিছু নিয়েই আমার পথচলা। কিন্তু দিনশেষে মনে হয়, আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিটুকুই যেন অপূর্ণ। কারণ এত কিছুর পরও আমার পাশে তুমি নেই।
বাবা, জানো, মানুষ যত বড়ই হোক, যত দূরেই এগিয়ে যাক, তার কাছে বাবার কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখনো ফুরায় না। আমারও ফুরায়নি। আজও কোনো কঠিন সময়ে তোমার ছায়া খুঁজি, কোনো আনন্দের মুহূর্তে তোমাকে পাশে পেতে চাই। আজও মনে হয়, তুমি থাকলে হয়তো সবকিছু একটু সহজ হতো।
তোমার সেই ছোট্ট মাটির ঘরটি আমার কাছে শুধু একটি কবর নয়, আমার শৈশব, আমার আশ্রয়, আমার সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা। প্রতি শুক্রবার সেখানে গিয়ে আমি যেন আবার তোমার কাছে ফিরে যাই। তোমাকে কিছু বলতে না পারার কষ্ট নিয়ে ফিরে আসি, আবার পরের শুক্রবার তোমার কাছে ছুটে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকি।
বাবা, তুমি ভালো থেকো। মহান আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুন। তোমার দোয়া যেন সারাজীবন আমার সঙ্গে থাকে। তোমার স্বপ্নগুলো পূরণ করার শক্তি যেন তিনি আমাকে দেন। তোমার রেখে যাওয়া মানুষগুলোর মুখে যেন হাসি ফোটাতে পারি।
শুধু একটা আক্ষেপই থেকে যাবে-আমার জীবনের এই পথচলায় তুমি পাশে নেই। তোমার হাতটি ধরে বলতে পারছি না, দেখো বাবা, তোমার ছেলে একটু একটু করে বড় হচ্ছে। তোমার স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।
বাবা, পৃথিবীর সব ঠিকানা পাওয়া যায়, শুধু তোমার কাছে ফিরে যাওয়ার ঠিকানাটা হারিয়ে ফেলেছি।
ভালো থেকো বাবা, ওই ছোট্ট মাটির ঘরে। তোমার ছেলে আজও তোমার অপেক্ষায়, তোমার স্মৃতির কাছে, তোমার ভালোবাসার ছায়ায়।
