শরিফুল ইসলাম
রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক বাঘা মসজিদ বাংলাদেশের মধ্যযুগীয় ইসলামী স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। রাজশাহী জেলা সদর থেকে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই প্রাচীন মসজিদটি ইতিহাস, স্থাপত্যশৈলী ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই দর্শনার্থী ও গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৫২৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুলতানি আমলে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহ। তিনি ছিলেন বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ-এর পুত্র। ৯৩০ হিজরি সালে নির্মিত এই মসজিদটি তৎকালীন হুসেন শাহী শাসনামলের স্থাপত্যশৈলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। সময়ের পরিক্রমায় মসজিদটি একাধিকবার সংস্কার করা হয়েছে। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মসজিদের গম্বুজের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরে সেগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়।
স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বাঘা মসজিদ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫ ফুট এবং প্রস্থ ৪২ ফুট। দেয়াল প্রায় ৮ ফুট পুরু এবং পুরো স্থাপনাটি চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত। মসজিদটিতে রয়েছে মোট ১০টি গম্বুজ, ৪টি মিনার এবং ৫টি প্রবেশদ্বার। ভেতরে রয়েছে ৬টি শক্ত স্তম্ভ, যা ছাদের গঠনকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে রেখেছে। এছাড়া মসজিদের ভেতরে চারটি কারুকার্যময় মেহরাব রয়েছে, যেগুলো অত্যন্ত নান্দনিক নকশায় অলংকৃত। প্রধান প্রবেশদ্বারের ওপর ফার্সি ভাষায় একটি শিলালিপিও খোদাই করা আছে।
বাঘা মসজিদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এর পোড়ামাটির টেরাকোটা অলংকরণ। মসজিদের ভেতর ও বাইরের দেয়ালে অসংখ্য নান্দনিক নকশা দেখা যায়। এসব নকশায় আমগাছ, শাপলা ফুল, লতাপাতা এবং বিভিন্ন জ্যামিতিক অলংকরণ ফুটে উঠেছে, যা সুলতানি আমলের শিল্পরুচি ও কারুশিল্পের উৎকর্ষকে প্রকাশ করে।
মসজিদের সামনে রয়েছে প্রায় ৫২ বিঘা জমির ওপর বিস্তৃত একটি বিশাল দিঘি, যা মসজিদ নির্মাণের সময় জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে খনন করা হয়েছিল। দিঘির চারপাশে সারিবদ্ধ নারিকেল গাছ ও মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ এলাকাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। শীত মৌসুমে এখানে বিভিন্ন প্রজাতির অতিথি পাখির সমাগম ঘটে, যা দর্শনার্থীদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করে।
মসজিদ প্রাঙ্গণের উত্তর পাশে হজরত শাহদৌলা ও তার পাঁচ সঙ্গীর মাজারও অবস্থিত। এছাড়া এলাকায় জহর খাকী পীরের মাজার এবং খননের মাধ্যমে আবিষ্কৃত একটি প্রাচীন ‘মহল পুকুর’-এর সন্ধান পাওয়া গেছে।
ঐতিহাসিক এই মসজিদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ঈদুল ফিতরের দিন থেকে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী ‘বাঘার মেলা’। প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই মেলায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ সমবেত হয়। সব মিলিয়ে ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল হিসেবে বাঘা মসজিদ আজও তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

