কাজী নূর :
বাংলা সাহিত্যকে আধুনিকতার নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেওয়া মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ১৫৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ, ২৯ জুন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ, সনেট এবং পাশ্চাত্য ধারার সার্থক নাটকের প্রবর্তক হিসেবে তিনি আজও সমানভাবে স্মরণীয়। স্বল্পায়ু সাহিত্যজীবন হলেও তাঁর সৃষ্টিকর্ম বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মধুসূদন দত্ত। তাঁর পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার একজন আইনজীবী এবং মাতা জাহ্নবী দেবী। শৈশবে মায়ের কাছেই তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি। পরে কলকাতার হিন্দু কলেজে (বর্তমান প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যয়নকালে বাংলা, সংস্কৃত, ফরাসিসহ বিভিন্ন ভাষায় শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে বিশপস কলেজে গ্রিক, লাতিন ও সংস্কৃত ভাষা অধ্যয়ন করেন এবং আইনশাস্ত্র পড়তে ইংল্যান্ডে যান।
মাইকেল মধুসূদন দত্তকে বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের অন্যতম প্রধান পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দের সফল প্রয়োগ করেন এবং ইউরোপীয় নাট্যরীতির অনুসরণে রচনা করেন ‘শর্মিষ্ঠা’। পাশাপাশি বাংলা ভাষায় সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতারও প্রবর্তন করেন। তাঁর এসব অবদান বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে নতুনভাবে পরিচিত করে।
মাইকেল মধুসূদন দত্তকে বলা হয় বাংলা সাহিত্যের ‘রেনেসাঁ’ ব্যক্তিত্ব অর্থাৎ ক্লাসিক্যাল শিক্ষা ও প্রজ্ঞার পুনরুজ্জীবন করা এক অন্যতম প্রবাদ পুরুষ। কলকাতার বিদ্যোৎসাহিনী সভা মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে এই মর্মে মত প্রকাশ করেছে যে– “আপনি বাঙলা ভাষায় যে অনুত্তম অশ্রুতপূর্ব্ব অমিত্রাক্ষর ছন্দে কবিতা লিখিয়েছেন, তাহা সহৃদয় সমাজে অতীব আদৃত হইয়াছে। ..আপনি বাঙলা ভাষার আদি কবি বলিয়া পরিগণিত হইলেন, আপনি বাঙলা ভাষাকে অনুত্তম অলঙ্কারে অলঙ্কৃত করিলেন, আপনা হইতে একটি নূতন সাহিত্য বাঙলা ভাষায় আবিষ্কৃত হইল, তজ্জন্য আমরা আপনাকে সহস্র ধন্যবাদের সহিত বিদ্যোৎসাহিনী সভাসংস্থাপক প্রদত্ত রৌপ্যময় পাত্র প্রদান করিতেছি।”
মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত শেক্সপিয়র, মিল্টন প্রমুখের মতো কীর্তিমান হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নানা ঝড়ঝঞ্ঝা তার জীবনকে এলোমেলো করে দেয়। বিশেষ করে সাহিত্য চর্চা বা সৃজনের ক্ষেত্রে। তিনি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স হয়ে নিজের মাতৃভূমিতে ফেরত এসেছেন ভাঙা হৃদয় নিয়ে। তারপর লিখলেন ‘বঙ্গভাষা’ নামে একটি চতুর্দশপদী কবিতা। যেখানে তিনি লিখেছেন, ‘হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;/তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,/পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ /পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি। আবার একই কবিতায় লিখলেন, ‘যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যা রে ফিরি ঘরে!/পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে/ মাতৃ-ভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণিজালে।
মধুসূদন দত্ত ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে চার্চ অব ইংল্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত ওল্ড মিশন চার্চে চার্চ ডীকন ডিয়লট্রির কাছে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ এবং নামের আগে যুক্ত করেন ‘মাইকেল’। এরপর থেকে তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত হিসেবে পরিচিত হন। মধুসূদন দত্ত খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণের পর তার মা শোকে দুঃখে শয্যাশায়ী হন। এসবের পর পিতা রাজনারায়ণ দত্ত চেষ্টা করেছিলেন মধুসূদনকে হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য। মধুসূদন বাবার মুখের ওপর সোজা বললেন, ‘যদি আকাশের চন্দ্র সূর্য না ওঠে, যদি পূর্বের বদলে পশ্চিমে সূর্যের উদয় হয় তবু আমি খ্রিস্টান ধর্ম পরিত্যাগ করব না।’ মধুসূদন এবং স্ত্রী রেবেকার সংসারে ৪টি সন্তানের জন্ম হয়। এ সময়ে কিশোরী হেনরিয়েটার প্রেমে পড়েন কবি মধুসূদন। পরে হেনরিয়েটাকে বিয়ে করেন তিনি। তার গর্ভেও জন্ম নেয় মধুসূদনের দুই সন্তান। এ সময় প্রচন্ড অভাবে পড়েন মধুসূদন। পাওনাদারদের চাপাচাপি ভুলে থাকতে মদ পান করে নেশার ঘোরে চলে যেতেন তিনি। মদ পান করে একটু মুক্তির উপায় খুঁজতেন মধুসূদন। তবে তার অভাবকালীন পুরোটা সময় পাশে ছিলেন বন্ধু ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর। এসব নিয়ে একটা গল্প চালু আছে, একবার এক মাতাল ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের নিকট টাকা চেয়েছেন। বিদ্যাসাগর বলেছেন, ’আমি কোনও মাতালকে টাকা দেই না’ ।
মাতালের পাল্টা প্রশ্ন: ’আপনি যে মধুসূদনকে টাকা দেন। সেও তো মাতাল’।
বিদ্যাসাগরের ঝাঁজালো উত্তর: তুমি মধুসূদনের একটা ’মেঘনাদবধ কাব্য’ লিখে নিয়ে আসো। তোমাকেও টাকা দেবো।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন কলকাতার আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৯ বছর। কলকাতার লোয়ার সার্কুলার রোড সমাধিক্ষেত্রে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর সমাধিফলকে উৎকীর্ণ রয়েছে স্বহস্তে রচিত বিখ্যাত পঙ্ক্তি—
“দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে!
তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে…”
মহাকবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর জন্মস্থান যশোরের সাগরদাঁড়িসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ, স্মরণসভা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে আধুনিকতার যে ভিত্তি মাইকেল মধুসূদন দত্ত নির্মাণ করে গেছেন, দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় পর আজও তা সমান প্রাসঙ্গিক। তাঁর সৃষ্টিকর্ম এবং সাহিত্যদর্শন বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে, যা আগামী প্রজন্মের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

