বেনাপোল সংবাদদাত :
দেশের সর্ববৃহৎ স্থলবন্দর বেনাপোল। প্রতিদিন এই বন্দর দিয়ে হাজার কোটি টাকার আমদানি-রপ্তানি হলেও বন্দরের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ১৩৯ বছরের ঐতিহ্যবাহী বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র যেন ভিন্ন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। ছয় মাস আগে দুটি একাডেমিক ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে প্রশাসন। কিন্তু বিকল্প ভবন না থাকায় শত শত কোমলমতি শিক্ষার্থীকে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই পাঠ নিতে হচ্ছে। কেউ ক্লাস করছে ভবনের বারান্দায়, কেউ আবার ধসে পড়ার আশঙ্কায় থাকা কক্ষের পাশেই। যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও দীর্ঘ ৩০ বছরেও বিদ্যালয়টির জন্য নির্মাণ হয়নি নতুন কোনো ভবন।
১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বেনাপোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একসময় এ অঞ্চলের অন্যতম স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। ১৯৬৫ সালে নির্মিত ‘কবি নজরুল ইসলাম ভবন’ এবং ১৯৯৬ সালে নির্মিত ‘কবি জসিমউদ্দিন ভবন’—দুটি ভবনই এখন ব্যবহার অনুপযোগী। উপজেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগ প্রায় ছয় মাস আগে ভবন দুটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করলেও আজও শুরু হয়নি নতুন ভবন নির্মাণের কাজ।
বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১২ জন শিক্ষক ও ৩৫৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। প্রয়োজন অন্তত ১০টি শ্রেণিকক্ষ, অথচ ব্যবহারযোগ্য রয়েছে মাত্র চারটি। একটি ভবনে অফিস, শিক্ষক কক্ষ এবং তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস চলছে। বাকি শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ না থাকায় বারান্দায় বসিয়ে পাঠদান করতে হচ্ছে। সংকট সামাল দিতে বিদ্যালয়ে দুই শিফটে ক্লাস পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে নতুন ভবনের জন্য শিক্ষা বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সময়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারেননি।
এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে শিশুদের পাঠদান করতে দেখে এগিয়ে এসেছেন কয়েকজন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিক্ষানুরাগী। তারা নিজস্ব উদ্যোগে বাঁশ ও টিন দিয়ে অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন, যাতে অন্তত শিক্ষার্থীদের সাময়িক দুর্ভোগ কমানো যায়।
বেনাপোলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিক্ষানুরাগী মতিয়ার রহমান বলেন, “এ বিদ্যালয়ের জন্য জরুরি ভিত্তিতে চারতলা একাডেমিক ভবন নির্মাণ প্রয়োজন। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানানো হয়েছে।”
আরেক শিক্ষানুরাগী ও ব্যবসায়ী আলহাজ হাবিবুর রহমান হবি বলেন, “শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ক্লাস করতে দেখে আমরা নিজেরাই বাঁশ ও টিন দিয়ে কয়েকটি অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছি। দ্রুত কাজ শুরু হবে।”
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা বেদৌরা পারভীন বলেন, “সাড়ে তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য অন্তত ১০টি শ্রেণিকক্ষ প্রয়োজন। কিন্তু ব্যবহারযোগ্য রয়েছে মাত্র চারটি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে ক্লাস নেওয়া বন্ধ করে এখন বারান্দায় পাঠদান করতে হচ্ছে। নতুন ভবনের জন্য বারবার তাগিদ দেওয়া হলেও আশ্বাস ছাড়া কিছুই পাওয়া যায়নি।”
শার্শা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রেহেনা বানু বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান বন্ধ করা হয়েছে। নতুন ভবনের জন্য ইতোমধ্যে সয়েল টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার আবেদন পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।”
দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন আধুনিক শ্রেণিকক্ষ নয়, নিরাপদে বসে পড়াশোনা করার ন্যূনতম পরিবেশের অপেক্ষায়। অথচ প্রতিদিন এই বন্দর দিয়ে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় হলেও সেই বন্দরের পাশের সরকারি বিদ্যালয়টি আজও একটি নিরাপদ ভবনের জন্য অপেক্ষা করছে।

