সাতক্ষীরা সংবাদদাতা
জীবিত ফেরার নয় অবশেষে অবসান হয়েছে কফিনবন্দি মরদেহ ফিরে আসার। প্রায় চার সপ্তাহ পর লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলামের মরদেহ দেশে ফিরেছে। তাদের নিথর দেহ গ্রামে পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, বিদেশে গিয়ে উপার্জন করে ভাগ্যবদল করবেন। কাজ করতেন একটি ফলের বাগানে। কিন্তু প্রায় এক মাস আগে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় তারা নিহত হন।
রোববার সকালে মরদেহ দুটি নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়।
এর আগে শনিবার গভীর রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় তাদের মরদেহ। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
গত ১১ মে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ে অঞ্চলের জিবদিন এলাকায় নিজ আবাসস্থলে রুটি বহনকারী একটি গাড়িতে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪০) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের নাহিদুল ইসলাম (২০)। তারা দুজনই ঋণ দেনা করে চলতি বছরের রোজার শুরুতে লেবাননে গিয়েছিলেন।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু জানান, শনিবার রাতে বিমানবন্দরে সরকারের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। পরে সেগুলো নিজ নিজ গ্রামের উদ্দেশে পাঠানো হয়। রোববার জোহরের নামাজের পর তাদের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
শফিকুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ হয়ে আছেন পরিবারের সদস্যরা। ১৮ বছরের সংসারে বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী রুমা খাতুন এবং দুই কন্যা সন্তানকে ঘিরেই ছিল তাঁর স্বপ্ন।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন শফিকুল। তার পাঠানো অর্থেই চলত পুরো সংসার। সেই মানুষটিকে হারিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তায় পরিবারটি। বড় মেয়ে মৌ আক্তার বিজ্ঞান বিভাগের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যুর পর তার পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সদর উপজেলার ভালুকা-চাঁদপুর গ্রামে শফিকুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনায় আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা ভিড় করেছেন। স্বামীর মরদেহ দেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন স্ত্রী রুমা খাতুন। দুই মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বিলাপ করছিলেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রুমা খাতুন বলেন, ‘সংসারের হাল ধরতে বিদেশে গিয়েছিল আমার স্বামী। ঋণ করে পাঠিয়েছি। এখন এই ঋণ শোধ করব কীভাবে? দুই মেয়েকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব?’
স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর চার সপ্তাহ ধরে মরদেহ ফেরানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কেটেছে রুমা খাতুনের। এখন সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। রুমা বলেন, ‘সচ্ছলতা আনতে গিয়েছিল, ফিরল লাশ হয়ে। মেয়েদের লেখাপড়া কীভাবে চালাব, জানি না।’
শফিকুলের মা আজেয়া খাতুন ছেলের নাম ধরে বিলাপ করছিলেন। পাশেই নির্বাক বসে ছিলেন বাবা আফসার আলী। চোখেমুখে অসহায়ত্বের ছাপ। আফসার আলী বলেন, ‘ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে গরু বিক্রি করেছি, এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছি, আত্মীয়দের কাছ থেকেও টাকা ধার করেছি। ভেবেছিলাম, ছেলে উপার্জন করে সংসারের কষ্ট দূর করবে। এখন সেই লাশ হয়ে ফিরল।’
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শফিকুল পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলেন। কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, “শফিকুলের আয়েই পুরো পরিবারটি চলত। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটি কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছে। পরিবারের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, অন্তত তার বড় মেয়ের জন্য একটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হোক।”
আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামেও একই চিত্র। মাত্র ২০ বছর বয়সে পরিবারের স্বপ্ন বুকে নিয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন নাহিদুল ইসলাম। স্বজনদের আশা ছিল বিদেশে কাজ করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করবেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই ফিরেন কফিনবন্দি হয়ে।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর মা, বাবা ও স্বজনদের আহাজারিতে পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। প্রতিবেশীরাও শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কান্না থামানো সম্ভব হয়নি।
নাহিদুলের বাবা আবদুল কাদের ও মা নুরুন্নাহার খাতুন ছেলের মরদেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মা নুরুন্নাহার বিলাপ করছিলেন আর বলছিলেন, ‘আমরা এখন কাকে নিয়ে বাঁচব, কীভাবে বাঁচব?’
কাদাকাটি ইউপির চেয়ারম্যান দীপঙ্কর সরকার বলেন, নাহিদুলের পরিবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত। সরকারি সহায়তা না পেলে তাঁরা বড় সংকটে পড়বে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার, খুলনার সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) খালেদুর রহমান জানান, মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরেই নিহতদের পরিবারের সদস্যদের দাফন-কাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকার চেক দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দুই প্রবাসীই বৈধভাবে বিদেশে গিয়েছিলেন। ফলে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে তিন লাখ টাকা এবং জীবন বীমার আওতায় এককালীন ১০ লাখ টাকা পাবেন। অর্থাৎ প্রত্যেক পরিবারের জন্য মোট ১৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা নির্ধারিত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, একই ঘটনায় আহত প্রবাসী শুভজিৎও নিয়ম অনুযায়ী সরকারি সহায়তা পাবেন।
সরকারি আর্থিক সহায়তা হয়তো কিছুটা আর্থিক সংকট লাঘব করবে। কিন্তু পরিবারের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কোনো অর্থেই পূরণ হওয়ার নয়।
যে মানুষগুলো জীবিকার তাগিদে হাজার মাইল দূরে পাড়ি জমিয়েছিলেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, তাদেরই নিথর দেহ ফিরে এলো কাঠের কফিনে। দুই মাস আগেও যাঁরা হাসিমুখে স্বজনদের বিদায় জানিয়েছিলেন, আজ তাদের মরদেহ ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন মা, স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয়স্বজন।
শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলামের এই মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু দুটি পরিবারের নয়, পুরো সাতক্ষীরার মানুষের হৃদয়েও গভীর বেদনার রেখা টেনে দিয়েছে।

