কাজী নূর :
‘এখন বেচাকেনা করার সময় দাদা। দেখছেন তো ক্রেতাদের কেমন ভিড়। পরে আসেন তখন বিস্তারিত তথ্য দেবো’ শুক্রবার সকালে যশোরের হাজী মোহাম্মদ মহসিন রোড বড়বাজারে বাংলার ভোর প্রতিবেদককে এমনটাই বলেছিলেন মাছ বিক্রেতা শিবায়ন রায়।
একই সুরে আরেক বিক্রেতা কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, দাদা অনেকদিন পর আজ বেচাকেনা ভালো হচ্ছে। বলতে গেলে ঈদের পর আজ বাজার জমে উঠেছে। পরে আসেন সব কথা বলবো।
বিক্রেতা রতন বিশ্বাস, আলমগীর খান, জয় বিশ্বাস বলেন, দাদা আজ জামাই ষষ্ঠীর বেচাকেনা হচ্ছে তো। বাজারে তাই এত ভিড়।
এ সময় কথা হয় শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের বাসিন্দা বাবু অলোক মজুমদারের সঙ্গে। বাংলার ভোরকে তিনি বলেন, আমার দুই মেয়ে। কাল বাড়িতে জামাইরা আসবে। তাই ৬ কেজি ওজনের কাতলা মাছ আর ৫ কেজি ওজনের রুই মাছ কিনেছি। তবে আজ মাছের দাম অনেক বেশি।
অলোক মজুমদার আরো বলেন, সেই সঙ্গে পোশাক, খাসির মাংস, মিষ্টি, এবং গ্রীস্মকালীন সব ধরনের ফল কিনেছি। যাতে করে জামাই ষষ্ঠীতে জামাই আপ্যায়নে ত্রুটি না হয়।
গয়ারাম সড়ক বেজপাড়ার বাসিন্দা দেবব্রত সাহা মনা বলেন, ষষ্টিতে বাজার থেকে ১২০০ টাকা করে ৫ কেজি খাসির মাংস এবং বড় কাতলা মাছ কিনেছি। যদিও আজ বাজারে মাছের দাম বেশি। কিন্তু জামাই ষষ্ঠী বলে কথা তাই বেশি দামেই কিনেছি। আমার একটি মেয়ে। কাল মেয়ে জামাই বাড়িতে আসবে।
দেবব্রত সাহা মনা আরো বলেন, মেয়ে ও জামাইকে দাওয়াত দিয়ে আপ্যায়ন করা জামাই ষষ্ঠীর রীতি। জামাই নতুন হোক বা পুরোনো। জামাই ষষ্ঠীর সম্পর্ক জামাই আর শাশুড়ির মধ্যে। পুরুষদের কাজ বাজার পর্যন্ত।
এদিন শাশুড়ি মেয়ে জামাইয়ের কপালে মা ষষ্ঠীর আশীর্বাদী ফোঁটা এবং হাতে হলুদ মাখানো সুতা বেঁধে তাদের কল্যাণ কামনা করেন।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে ৫ থেকে সাড়ে ৫ কেজি সাইজের রুই মাছ ৭৫০ টাকা, ১ থেকে দেড় কেজি সাইজের রুই ৩৬০ টাকা, ৬ কেজি সাইজের কাতলা ৬৫০ টাকা, ৪ থেকে সাড়ে ৪ কেজি সাইজের কাতলা ৪৪০ টাকা, মায়া ৬০০ টাকা, হরিণা চিংড়ি ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা, শোল ৬০০ টাকা, কৈ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, নাইলোটিকা ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, পাঙাশ ২২০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
মাছ বিক্রেতা রতন বিশ্বাস বলেন, আজ জামাই ষষ্ঠী উপলক্ষে বেশি দাম দিয়ে নড়াইলের বড়বড় রুই, কাতলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কিনেছি। ক্রেতারা ৭/৮ কেজি সাইজের মাছ বেশি কিনছেন। আমি বড় মাছ ১২টি কিনেছিলাম। সবকটি বিক্রি হয়ে গেছে।
এদিকে ৫০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ ১৩০০ টাকা, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ ১৬০০ থেকে ২৫০০ টাকা, ৯০০ থেকে ১ কেজি সাইজের ইলিশ ২৮০০ থেকে ৩০০০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
ইলিশ মাছ বিক্রেতা ওহিদুল ইসলাম, আব্দুল জলিল, লোকনাথ সাধুসহ অনেকে বলেন, ইলিশের দাম একটু বেশি হলেও বিক্রি ভালো। ঈদের পর আজ বাজার খুব ভালো যাচ্ছে।
শহরের বরদাকান্ত রোড চাঁচড়ার বাসিন্দা সাধন কুমার দেবনাথ শম্ভু বলেন, বাবা মা পরলোকগত হয়েছেন। তিন বোন তাদের স্বামী সন্তান নিয়ে কাল বাড়িতে আসবেন। বা মা নেই এটি যেন বোন জামাই কেউ অনুভব করতে না পারে সাধ্য অনুযায়ী সেই চেষ্টা করছি।
মাংসের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সবএেয় বেশি বিক্রির তালিকায় রয়েছে খাসি। ১১০০ থেকে ১২৫০ টাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি খাসির মাংস বিক্রি হয়েছে এদিন।
খাসির মাংস বিক্রেতা মোহাম্মদ পাপ্পু বলেন, কোরবানির পর আজ রেকর্ড পরিমাণ খাসির মাংস বিক্রি হয়েছে।
মুরগির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, লেয়ার ৩৬০ থেকে ৩৮০ টাকা, সোনালি ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকা ও দেশি মুরগি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
গোলাম মোস্তফা সড়ক, ঘোপ রাজুর মোড়ের বাসিন্দা আব্বাস আলী বলেন, আজ বাজার করার পরিস্থিতি নেই। যেটাতে হাত দিচ্ছি সেটাতেই আগুন। সব রকম মুরগির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। আর মাছের গায়ে তো হাত দেয়া দায়।
বিসমিল্লাহ ব্রয়লার হাউজের স্বত্বাধিকারী নুরুজ্জামান জনি বলেন, ঈদের পর থেকে বাজার খারাপ যাচ্ছিল। আজ দাম বেশি বেচাকেনাও ভালো।
মুদিপণ্যের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল কেজি প্রতি ২০৫ থেকে ২০৭ টাকা, সরিষার তেল ২২০ থেকে ২৩০ টাকা, পাম তেল থেকে ১৮৫ টাকা, পোলাও চাল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, আটা ৪০ থেকে ৪৫ টাকা, ময়দা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, মসুরি ডাল ১০০ থেকে ১৬০ টাকা, মুগ ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা, ছোলার ডাল ৯০ থেকে ১০০ টাকা, বুটের ডাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, সাদা চিনি ১০৫ টাকা, লাল চিনি ১২০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। এছাড়া আলু ২৫ টাকা, পেঁয়াজ ৩৫ টাকা, আদা ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, রসুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। এছাড়া লাল ডিম হালি প্রতি ৪০ থেকে ৪২ টাকা, সাদা ডিম ৩৬ টাকা বিক্রি হয়েছে।
শহরের মুনশী মিনহাজ উদ্দিন সড়ক, পোস্ট অফিস পাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ সেলিম বলেন, সপ্তাহিক ছুটির দিনে বাজার করি।
আজ বাজারে সবকিছুর দাম বেশি। এমন কি পোলাও চাল কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
মেসার্স হিমু স্টোরের স্বত্বাধিকারী গোপাল চন্দ্র ঘোষ বলেন, পোলাও চালের দামটা একটু বেড়েছে। এছাড়া সবকিছু ঠিকঠাক আছে। তবে বোতলজাত সয়াবিন তেল কোম্পানি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে।
চালের বাজার চাউল চান্নী ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে বাসমতি চাল কেজি প্রতি ৭৬ থেকে ৭৮ টাকা, পাইজাম ৪৯ টাকা, সুপার মিনিকেট ৫৮ থেকে ৬০ টাকা, কাজললতা ৪৯ টাকা, নাজির শাইল ৮৫ থেকে ৮৮ টাক, স্বর্ণা ৫২ থেকে ৫৩ টাকা, আটাশ ৫২ থেকে ৫৪ টাকা, মোটা ৪৫ থেকে ৫০ টাকা ও বিল আমন ৬০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
চাল বিক্রেতা অসিত স্টোরের স্বত্বাধিকারী অসিত সাহা বলেন, ঈদের পর থেকে বাজার বেশ খারাপ যাচ্ছিল। তবে গত ২/৪ দিনে বেচাকেনা বেড়েছে।
সবজির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে মানভেদে ওল কেজি প্রতি ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা, কাঁচা কলা ৪০ থেকে ৬০ টাকা, পটল ১০ থেকে ২০ টাকা, বরবটি ৩০ থেকে ৬০ টাক, শসা ৪০ টাকা, কাকরোল ৫০ থেকর ৭০ টাকা, ঝিঙে ২০ থেকে ৩০ টাকা, করলা ৪০ থেকে ৬০ টাকা, বেগুন ৫০ থেকে ১২০ টাকা, পুইশাক ২০ টাকা, ঢেরস ২০ থেকে ২৫ টাকা, মানকচু ৬০ টাকা, কচুর লতি ৪০ থেকে ৬০ টাকা, কচুর মুখি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, আমড়া ৫০ টাকা, ধুন্দল ২০ থেকে ৩০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ টাকা, কুমড়ো ৪০ টাকা, ডাটা ৩০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৫০ থেকে ১২০ টাকা, পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা, টমেটো ১০০ থেকে ১২০ টাকা, গাজর ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, লাল শাক ৩০ টাকা ও কুশি ৪০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
এছাড়া পিস হিসেবে লাউ ৩০ থেকে ৪০ টাকা ও চাল কুমড়ো ৩০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
শহরের মাওলানা মোহাম্মদ আলী সড়কের বাসিন্দা সুবাস সাহা বলেন, আজ বাজারে একমাত্র সবজি সস্তা। বাদবাকি সবকিছুর গায়ে আগুন লেগেছে।
সবজি বিক্রেতা রাকিব হাসান বলেন, পানির চেয়েও এখন সবজির দাম কম। বিক্রি ভালো হচ্ছে তবে সবজির এমন দামে কৃষক বাঁচবে তো এমন প্রশ্ন রাখেন রাকিব হাসান।

