কাজী নূর
বাংলাদেশের ইলিশের জন্য যে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ একসময় চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতেন, আজ সেই ভারতীয় ইলিশে সয়লাব দেশের বাজার। যশোরের ঐতিহ্যবাহী বড়বাজারে সরজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ভারতীয় ইলিশের এই অপ্রত্যাশিত আগমন ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয় পক্ষেই তৈরি করেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও বিভাজন।
শুক্রবার সকালে যশোরের হাজী মোহাম্মদ মহসিন রোড বড়বাজারে সরেজমিনে ঘুরে পাওয়া গেছে এমন তথ্য।
একদিকে একশ্রেণীর ক্রেতার জন্য ভারতীয় ইলিশ নিয়ে এসেছে দারুণ স্বস্তি। দামের ফারাক আকাশ-পাতাল ১ কেজি সাইজের বরিশালের দেশি ইলিশ যেখানে মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ২৪০০ থেকে ২৭০০ টাকায়, সেখানে একই ওজনের ভারতীয় ইলিশ মিলছে মাত্র ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকায়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের বড় অংশই এই সুযোগটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সাধারণ ক্রেতা আবু সাঈদ বুলবুল ও বিশাল সাহার মতে, ভারতীয় ইলিশের দাপটে হলেও বাজারে দেশি ইলিশের দাম কিছুটা কমেছে। স্বল্প আয়ের মানুষ হিসেবে কম দামে ইলিশের স্বাদ নিতে পারা তাদের জন্য বড় আনন্দের বিষয়।
তবে এই স্বস্তির উল্টো পিঠেই জমাট বেঁধেছে গভীর আশঙ্কা ও অস্বস্তি। সবচেয়ে বড় ভয়-বরিশালের ইলিশ বলে ভারতীয় ইলিশ চালিয়ে দেয়ার প্রতারণা। ক্রেতাদের মূল অভিযোগ, ভারতীয় ইলিশ কিছুটা লম্বাটে, লালচে এবং স্বাদ ও গন্ধে রূপালি দেশি ইলিশের ধারেকাছেও নয়। না রান্না করা পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতার পক্ষে এই পার্থক্য বোঝা প্রায় অসম্ভব। প্রশাসনের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে-ভারতীয় মাছ বিক্রি করলে তা বোর্ডে লিখে টাঙিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু বেশিরভাগ অসাধু ব্যবসায়ী তা মানছেন না। ফলে ভারতীয় ইলিশ কিনে ঠকে যাওয়ার ভয়ে অনেকে মাছ বাজারের দিকেই পা বাড়াচ্ছেন না।
কথা হয় হাজী মোহাম্মদ মহসিন রোডের জব্বার সন্স’র স্বত্বাধিকারী নাছির হোসেনের সঙ্গে। বাংলার ভোরকে তিনি বলেন, আসলে আমি বাংলাদেশি আর ভারতীয় ইলিশের পার্থক্য করতে পারবো না। বিধায় ইলিশ কেনার ইচ্ছা থাকলেও ফিরে যাচ্ছি। ভারতীয় ইলিশ বিদায় হলে তখন কিনবো।
কথা হয় স্টেশনারী ব্যবসায়ী বাবুল শেখের সঙ্গে। বাংলার ভোরকে তিনি বলেন, তিন সপ্তাহ পূর্বে যে দামে ইলিশ মাছ কিনেছিলাম এখন সেটি ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে সত্য। কারণটি ভারতীয় ইলিশের প্রভাব।
ঘোপ পিলুখান সড়কের বাসিন্দা আবু সাঈদ বুলবুল বলেন, ভারতীয় ইলিশের দাপটে যদি বাংলাদেশি ইলিশের দাম কমে সেটি তো ভোক্তাদের জন্য ভালো। এমনিতে তো আর দাম কমবে না। এ দাপটে অল্প দামে বরিশালের ইলিশও খাওয়া হবে, মনের ইচ্ছেও পূর্ণ হবে। বলতে পারেন, রথ দেখা, কলা বেচা দুটোই একসঙ্গে হলো।
কথা হয় উমেশ চন্দ্র লেন কাঁসাররিপট্টির বাসিন্দা বিশাল সাহার সাথে। তিনি বলেন, আনন্দের খবর হচ্ছে, ভারতীয় ইলিশের ভয়ে বাংলাদেশি ইলিশের দাম কমেছে। আমরা স্বল্প আয়ের মানুষ। অল্প দামেই প্রকৃতির এ দানকে চেখে দেখতে চাই।
হাজী আব্দুল করিম লেন চুড়িপট্টির বাসিন্দা শেখ রোমান বলেন, ভারতীয় ইলিশ লম্বাটে, হালকা লাল এবং স্বাদে আমাদের রুপালি ইলিশের ধারে কাছেও না।
ভারতীয় ইলিশকে বরিশালের ইলিশ বলে চালিয়ে দেয়ার অভিযোগকে অস্বীকার করে বড়বাজার মৎসজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, ক্রেতাদের দুটি ইলিশ দেখিয়ে কোনটি কোন দেশের তা বলা হচ্ছে। ক্রেতা যেটি চাইছেন তাকে সেটি দেয়া হচ্ছে। এখানে প্রতারণা করার বিষয়টি ক্রেতাদের না চেনার কারণ থেকে উদ্ভব হয়েছে।
ইলিশ বিক্রেতা এরশাদ আলী বলেন, ভারতীয় ইলিশের চাপে বরিশালের ইলিশ বিক্রি করতে কষ্ট হচ্ছে। কারণ ১ কেজি সাইজের বরিশালের ইলিশ বর্তমানে মানভেদে ২৪০০ থেকে ২৭০০ টাকা। সেখানে একই সাইজের ভারতীয় ইলিশ ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকা।
এরশাদ আলী আরো বলেন, যারা বরিশালের ইলিশ চিনে একমাত্র তারাই ভারতীয় ইলিশ বয়কট করে দেশি ইলিশ কিনছে।
ভারতীয় ইলিশ মাছ বিক্রি করছেন জালাল শেখ। তিনি বলেন, দামের অনেক পার্থক্যের কারনে ক্রেতারা ভারতীয় ইলিশ মাছ কিনছেন। তবে সেটির সংখ্যা কম। অনেকে বরিশালের ইলিশ কিনছেন, কেউ দাম শুনে ফিরে যাচ্ছেন।
আরেক বিক্রেতা শাহিন বলেন, যদি বরিশালের ইলিশ কেনার সক্ষমতা না থাকে আবার স্বাদের দিক চিন্তা করেন তবে আমি বলবো বাংলাদেশি সিলভার কার্প মাছ খান। তবু ভারতীয় ইলিশ মাছ নয়। সেটি না হলে পেঁপে ভর্তা খান।
কথা হয় ‘মাছ কাটিয়ে’ আলামিন এবং শুকুর মোল্লার সঙ্গে। তারা জানান, এখন ইলিশ মাছ কম বিক্রি হয়। কারণ হিসেবে তারা বলেন, এই মৌসুমে ইলিশ কাটতে কাটতে হয়রান হতে হয়। রোজ গড়ে ২০ থেকে ৩০ কেজি মাছ কাটি সেখানে ইলিশ মাছ ৩ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত পাই।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে ১ কেজি সাইজের ইলিশ ২৪০০ থেকে ২৭০০ টাকা, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা, ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকা ও ২৫০ গ্রাম সাইজের ইলিশ ৭৫০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
এদিকে স্বাদু পানির মাছের বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে ২ কেজি সাইজের রুই কেজি প্রতি ৪০০ টাকা, ৪ কেজি সাইজের কাতলা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, পারশে ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা, আইড় ৭০০ টাকা, পাবদা ৩২০ টাকা, পাবদা ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা, নাইলোটিকা ২২০ টাকা, ভেটকি ৮৫০ টাকা, বেলে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, পুঁটি ২৫০ টাকা, চাকা চিংড়ি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, বাগদা চিংড়ি ৮০০ টাকা, হরিণা চিংড়ি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, টেংরা ৪৫০ থেকে ৬০০ টাকা, শিং ৪০০ টাকা, চাপলে ৪০০ টাকা, কৈ ২০০ থেকে ৩০০ টাকা ও পাঙাশ ১৮০ থেকে ৩৩০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
মাছ বিক্রেতা কালা বিশ্বাস ও তালেব মোল্লা বলেন, ইলিশ মাছের চাপ নেই। তাই বেচাকেনা ভালো। তবে বাজার স্থিতিশীল রয়েছে।
শহরের নাজির শংকরপুররে বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা কাজী শফিকুর রেজা বলেন, বাজারে রুই, কাতলা মাছের দাম একটু বেশি, অন্যগুলো ঠিক আছে।
মুদিপণ্যের বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল কেজি প্রতি ২০৬ থেকে ২০৭ টাকা, সরিষার তেল ২২০ টাকা, পাম তেল থেকে ১৮৬ থেকে ১৯০ টাকা, সুপার তেল ১৯৫ টাকা, পোলাও চাল ১৪০ থেকে ২২০ টাকা, আটা ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা, ময়দা ৬২ থেকে ৭০ টাকা, ছোলার ডাল ১০০ থেকে ১১০ টাকা, বুটের ডাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, মুগ ডাল ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, মসুরির ডাল ১০০ থেকে ১৬০ টাকা, সাদা চিনি ১১০ টাকা, লাল চিনি ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা, আলু ২৫ টাকা, পেঁয়াজ ৫০ টাকা, আদা ১৯০ থেকে ২১০ টাকা ও রসুন ৮০ থেকে ১৩০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
মুদিপণ্য বিক্রেতা রওনক ভ্যারইটি স্টোরের স্বত্বাধিকারী শাকিল আহমেদ বলেন, পাড়ায় পাড়ায় এখন মুদি দোকান। আমাদের বেচাকেনা ভালো না।
সবজির বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে মানভেদে বেগুন কেজি প্রতি ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, পটল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, কচুর মুখি ৫০ টাকা, কচুর লতি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, মানকচু ৪০ থেকে ৫০ টাকা, ধুন্দল ৫০ টাকা, উচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা, শষা ৮০ টাকা, ওল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, কুমড়ো ৫০ থেকে ৬০ টাকা, টমেটো ১০০ টাকা, ঝিঙে ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ভেন্ডি ৬০ টাকা, পেঁপে ২০ থেকে ৩০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, সবুজ শাক, লাল শাক ৫০ থেকে ৬০ টাকা, গাজর ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা, পুঁইশাক ৩০ টাকা, কুশি ৬০ টাকা, ধনেপাতা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, আমড়া ৩০ টাকা, সজনে ২০০ টাকা, কাকরোল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, চাল কুমড়ো ও লাউ আকারভেদে পিস হিসেবে ৪০ থেকে ৬০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
এছাড়া আগাম শীতকালীন সবজি ফুলকপি ১৮০ টাকা, বাঁধাকপি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, মুলো ৫০ থেকে ৬০ টাকা, জলপাই ১০০ টাকা, বিট কপি ১২০ টাকা, শিম ১৬০ থেকে ২০০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ সালাম বলেন, বেগুন এবং শষার সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দুটি বাদে বাজার স্থিতিশীল রয়েছে।
কথা হয় দর্জি শ্রমিক জয়নাল গাজীর সঙ্গে। তিনি বলেন, শুধু সবজি কেন, গোটা বাজারেই আগুন। বলেন কোনটি খেয়ে পরে আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষ খেয়ে-পরে বেঁচে থাকবে।
মুরগির বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা, লেয়ার ৩৫০ থেকে ৩৭০ টাকা, সোনালি ২৬০ থেকে ২৯০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
মানিক ব্রয়লার হাউজের স্বত্বাধিকারী শাহজালাল মিয়া বলেন, বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। বরং সামনে দাম কিছুটা কমতে পারে। এতে ভোক্তা লাভবান হলেও খামারি ঘাটতিতে আছে। নভেম্বরে বিয়ে, পিকনিকের সিজন শুরু হলে মুরগির দাম বৃদ্ধি পেতে পারে বলে জানান শাহজালাল মিয়া।
গরু ও খাসীর মাংসের বাজার ঘুরে দেখা গেছে বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। গরু ৭৭০ থেকে ৮০০ টাকা ও খাসীর মাংস ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
যশোর বিফ হাউসের স্বত্বাধিকারী শেখ শওকত আলী ও বিসমিল্লাহ খাসী ঘরের স্বত্বাধিকারী জিহাদ হাসান বলেন, এখন দাম স্থিতিশীল রয়েছে তবে সামনে বিভিন্ন মৌসুমে দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।
ডিমের বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে হালি প্রতি লাল ডিম ৪৬ থেকে ৫০ টাকা, সাদা ডিম ৪২ থেকে ৪৫ টাকা বিক্রি হয়েছে।
ডিম বিক্রেতা আরশাদ হোসেন বলেন, বৃষ্টি এবং গরম কমলে ডিমের দাম কিছুটা কমতে পারে।
চালের বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে মিনিকেট ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, পাইজাম ৪৯ টাকা, বাসমতি ৭৬ থেকে ৮০ টাকা, আটাশ ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, সুবর্ণলতা ৫৫ টাকা, নূরজাহান ৫০ টাকা, নাজিরশাল ৯৫ টাকা ও বিল আমন ৬০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
চাউল চান্নীর মেসার্স লোকনাথ ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী আজয় কুমার সাউ বলেন, বাজার স্থিতিশীল রয়েছে, বেচাকেনা ভালো না। পূজার পর থেকে বাজার ঘুরতে পারে।
