বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
বিশ্বের অন্যতম দামি মসলা ভ্যানিলা। বিদেশে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বিশেষ ব্যবস্থায় চাষ হলেও যশোরের চৌগাছায় ভিন্ন এক উদ্যোগ নিয়েছেন উদ্যোক্তা সারোয়ার হোসেন। কোনো ব্যয়বহুল শেড নির্মাণ না করে আমবাগানের প্রাকৃতিক ছায়ায় গড়ে তুলেছেন ভ্যানিলার বাগান। তার পাঁচ শতাংশ জমিতে এখন বেড়ে উঠছে প্রায় ১৫০টি গাছ। এসেছে ফলও। তবে চাষে সাফল্য মিললেও উৎপাদিত ভ্যানিলা বিক্রির নির্দিষ্ট বাজার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকায় বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
ড্রাগন ফল চাষের পাশাপাশি নতুন ফসল হিসেবে ভ্যানিলা চাষের উদ্যোগ নেন সারোয়ার। যশোরের চৌগাছা উপজেলার সরর্পরাসপুর গ্রামের এই উদ্যোক্তা ২০১৯ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ৫০টি চারা দিয়ে শুরু করেন ভ্যানিলা চাষ। নতুন ফসল হওয়ায় শুরুতে চাষের অভিজ্ঞতা ছিল না তার। নানা প্রতিকুলতায় ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন বর্তমান বাগান।
সারোয়ার হোসেনের ভ্যানিলা চাষের যাত্রা শুরু ২০১৯ সালে। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে ৫০টি চারা রোপণ করেন তিনি। কিন্তু নতুন ফসল হওয়ায় চাষের অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথম দফাতেই মারা যায় ২৫টি গাছ। তবু হাল ছাড়েননি তিনি। নতুন করে চারা সংগ্রহ করে আবারও চাষ শুরু করেন। প্রথমে টাইফুয়েন্সি জাতের ভ্যানিলা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও পরে ভারত থেকে প্লানিফুলিয়া জাতের চারা সংগ্রহ করেন।
এরপর নিজের অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে চাষের কৌশল রপ্ত করেছেন সারোয়ার। বর্তমানে তার বাগানে প্রায় ১৫০টি ভ্যানিলা গাছ রয়েছে। ছোট আমগাছের ছায়ায় লতানো গাছগুলো বেড়ে উঠছে। গাছে ফল আসায় নিজের উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী তিনি।
সারোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশে ভ্যানিলা হবে না, এমন কোনো জায়গা নেই। এখন দরকার উৎপাদন বাড়ানো। দেশে যদি ১০০ জন কৃষককে প্রয়োজনীয় ভ্যানিলা কাটিং সরবরাহ করা হয়, তাহলে চার থেকে পাঁচ বছর পর এক হাজার কেজি ভ্যানিলা বিন রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব। তখন আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এমনিতেই বাংলাদেশে আসতে শুরু করবেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভ্যানিলা চাষের জন্য নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি করতে শেড ব্যবহার করা হয়। কিন্তু শেড নির্মাণ ব্যয়বহুল হওয়ায় বিকল্প পথ খুঁজেছেন সারোয়ার। শেষ পর্যন্ত আমবাগানের প্রাকৃতিক ছায়াকেই কাজে লাগিয়েছেন তিনি। তার বাগানে সরাসরি রোদ ও ছায়ার মধ্যে ভারসাম্য রেখে বেড়ে উঠছে ভ্যানিলাগাছ।
সারোয়ার জানান, অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা ভ্যানিলা চাষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়। তিনি আমবাগানের আধো আলো-আধো ছায়ার পরিবেশকে বেছে নিয়েছেন। পাঁচ শতাংশ জমিতে বাগান গড়ে তুলতে এখন পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা। পরিচর্যা ও উৎপাদন ঠিক থাকলে এই বাগান থেকে বছরে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব বলে আশা করছেন তিনি।
তবে ভ্যানিলা চাষে শুধু চারা রোপণ করলেই হয় না। জমি ও গাছের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হয়। সারোয়ার জানান, আট ধরনের উপকরণ দিয়ে প্রতিটি বেড প্রস্তুত করতে হয়। এরপর সেখানে ভ্যানিলার কাণ্ড রোপণ করা হয়। গাছের বৃদ্ধি ও ফলন ঠিক রাখতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি।
সারোয়ারের বাগানে কাজ করেন আল-আমিন হোসেন। তার অভিজ্ঞতায়, ভ্যানিলা চাষে নিয়মিত ভারি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। মাঝে মধ্যে সেচ দিতে হয়। বেডে মাটির ব্যবহার কম থাকায় আগাছাও তুলনামূলক কম জন্মায়। তবে ছত্রাকের আক্রমণ একটি সমস্যা। গাছের অবস্থা দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়।
ভ্যানিলা পৃথিবীর দ্বিতীয় দামি মসলা হিসেবে পরিচিত। দামের দিক থেকে এর ওপরে রয়েছে জাফরান। সুগন্ধ ও স্বাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে খাদ্য, পানীয় ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্যে ভ্যানিলার ব্যবহার রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা রয়েছে। কয়েক বছর আগে বৈশ্বিক বাজারে প্রতি কেজি ভ্যানিলা ৫৫০ ডলার বা প্রায় ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হতো। পরে কৃত্রিম ভ্যানিলার উৎপাদন বাড়ায় প্রাকৃতিক ভ্যানিলার দাম কমে আসে। বিভিন্ন বাজার তথ্যে প্রতি কেজি ভ্যানিলার দাম প্রায় ২৫০ ডলার বা ৩০ হাজার টাকার আশপাশে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভ্যানিলার মান, গ্রেড ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ধরন অনুযায়ী দামের পার্থক্য রয়েছে।
আল-আমিন হোসেন বলেন, ভ্যানিলাগাছের পরিচর্যা খুব বেশি কঠিন নয়। তবে রোগবালাইয়ের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। ফল সংগ্রহের সুবিধার্থে গাছের লতাকে ওপর থেকে ঘুরিয়ে নিচের দিকে নামিয়ে দেয়া হয়। এতে ফল সংগ্রহ সহজ হয়।
সারোয়ারের বাগানে ভ্যানিলার ফল দেখে আগ্রহী হচ্ছেন এলাকার অন্য উদ্যোক্তারাও। তাদের একজন চৌগাছার আশিকুল ইসলাম মিথুন। বিশ্বের অন্যতম দামি মসলার চাষ নিজের এলাকায় হচ্ছে শুনে বাগান দেখতে এসেছেন তিনি।
মিথুন বলেন, আমাদের উপজেলায় ভ্যানিলা চাষ হচ্ছে শুনে দেখতে এসেছি। এসে গাছে থোকায় থোকায় ভ্যানিলা দেখলাম। এর সুগন্ধও দারুণ। কিন্তু এই ফল সরাসরি বিক্রি কিংবা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করার সম্ভাবনা কীভাবে তৈরি হবে, তা বুঝতে পারছি না। সরকারের উচিত এই ফসল নিয়ে কাজ করা। কৃষি বিভাগ যদি আধুনিক চাষাবাদের আওতায় এনে কৃষকদের মধ্যে ভ্যানিলা চাষ ছড়িয়ে দেয়, তাহলে অনেকেই আগ্রহী হবেন।
মূলত এখানেই সারোয়ারের উদ্যোগের বড় চ্যালেঞ্জ। চাষের পদ্ধতি রপ্ত করে উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও দেশে ভ্যানিলার নির্দিষ্ট বাজারব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। কাঁচা ফল বিক্রি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
যশোরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা বলেন, ভ্যানিলাকে বাজার উপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু দুর্বলতা রয়েছে। এটি এমন কোনো পণ্য নয় যে কাঁচাবাজার থেকে মানুষ সবজির মতো কিনে নিয়ে যাবে। ভ্যানিলা প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করতে হবে। কৃষক এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ভ্যানিলা প্রক্রিয়াজাত করে দেশের বাজারে, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপণনের ব্যবস্থা করতে সহযোগিতা করা হবে।
চৌগাছায় ভ্যানিলা চাষের খবর পেয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও। তবে ফসলটি দেশে তুলনামূলক নতুন হওয়ায় এর চাষাবাদ সম্পর্কে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও বিস্তারিত ধারণা নেই। এ কারণে সরেজমিনে বাগান পরিদর্শন করে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক জাহিদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, ভ্যানিলা আমাদের দেশে নতুন ধরনের ফসল। এ কারণে এর চাষাবাদ সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিত ধারণা নেই। তবে চৌগাছার সারোয়ার হোসেন নামে একজন কৃষক ভ্যানিলা চাষ করেছেন বলে জানতে পেরেছি। দ্রুতই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের নিয়ে তার বাগান পরিদর্শনে যাব। তাদের মতামতের ভিত্তিতে এই চাষ সম্প্রসারণের বিষয়টি আঞ্চলিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ কমিটির সভায় উত্থাপন করা হবে।
