মহেশপুর সংবাদদাতা
মহেশপুরে নিখোঁজ স্কুলছাত্রী নিঝুমের সন্ধান মিললেও ফেরেনি স্বজনদের বুকে। নিখোঁজের দিনে ঘুরতে গিয়ে প্রেমিকের হাতে প্রাণ হারায় সে। আর এরই সাথে মেয়ে ফিরে আসার অপেক্ষার শেষ হলো না মা তাসলিমা খাতুনের। নিঝুম উপজেলার ফতেপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেনীর ছাত্রী ছিলেন। দীর্ঘ আঠার মাস পর ঝিনাইদহ জেলা সাইবার ইনভেস্টিগেশন সেলের সদস্যরা অপহৃত স্কুলছাত্রী নিঝুমের হত্যার রহস্য উদঘাটন করেন। ঘাতক প্রেমিক মাশরিকুল রহমান জিম রাখালভোগা গ্রামের কামাল হোসেন ছেলে ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের অঙ্গসংগঠন ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। আটকের পর প্রেমিকা নিঝুম হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ননা দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ছাত্রলীগের এ নেতা।
এর আগে গত বছরের ১৩ মার্চ নিখোঁজ হন হতদরিদ্র মায়ের সন্তান নিঝুম খাতুন। মা তাসলিমা খাতুন সাধারণ ডায়েরি করে মেয়ের কোন সন্ধান না পেয়ে ৫ জনকে আসামি করে অপহরণ মামলা করেন।
জবানবন্দিতে ঘাতক প্রেমিক জানিয়েছেন, স্কুলছাত্রী নিঝুমের সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কে বেড়ানোর কথা বলে ঘটনার দিন প্রেমিকাকে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী পাকশী রেল স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে ঘোরাঘুরির একপর্যায়ে তারা জনশূন্য পাকশী রেল লাইনের উপরে প্ল্যাটফর্মে বসে থাকা অবস্থায় নিঝুম প্রমিক জিমকে বিয়ে করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। এ সময় তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে ঘাতক জিম রাগান্বিত হয়ে নিঝুমকে সজোরে থাপ্পড় মারেন। এতে নিঝুম জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান। এরপর টেনে হেঁচড়ে ঘাতক জিম সজ্ঞাহীন নিঝুম’কে রেল লাইনের নিচের নির্জন জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে যায়। সেখানে ওড়না দিয়ে গলা পেঁচিয়ে মাথার উপর পা দিয়ে সজোরে চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে প্রেমিকা নিঝুমের মৃত্যু নিশ্চিত করেন। আসামি জিম লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে জঙ্গলের পাশে নির্জন স্থানে নিঝুমকে ফেলে রেখে পরের ট্রেনে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এরপর ঘাতক জিম নিঝুমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে বান্ধবীকে বার্তা পাঠিয়ে জানান, “আমি যশোরের একটি ছেলের সাথে পালিয়ে এসেছি; যতদিন আমার মা আমাদের মেনে না নেয় ততদিন পর্যন্ত আমি বাড়ি ফিরবো না। তুই আমার মায়ের নম্বরে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানিয়ে দিস”।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই হিমানিষ জানান, প্রেমিকাকে হত্যার পর দীর্ঘদিনর পঞ্চগড়, রাজশাহী, বগুড়া, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন ঘাতক জিম। দীর্ঘ সময় পরে গত ঈদে বাড়িতে ফিরলে পুলিশ তাকে আটক করে তিন দিনের রিমান্ডে নেন কিন্তু ওই তিন দিনে মুখ খুলেননি জিম। পরে সে জামিনে বেরিয়ে আসেন। এরপর জামিন আবেদন বাতিল করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হলে ঘাতক প্রেমিক মাশরিকুল রহমান জিম মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) আদালতে নিঝুম হত্যার বর্ণনা দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
আসামির দেয়া তথ্য মোতাবেক সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম আসামিকে সাথে নিয়ে ঈশ্বরদী থানার পাকশী রেল স্টেশনের ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে তদন্তের একপর্যায়ে জানা যায় ভিকটিম নিঝুমের অর্ধগলিত মরদেহ ঈশ্বরদী থানা পুলিশ গত বছরের ১৭ই মার্চ দুপুরে অজ্ঞাতনামা লাশ হিসেবে উদ্ধার করে। মরদেহের পরিচয় সনাক্ত না হওয়ায় ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহটি পাবনা আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সহায়তায় দাফন করা হয়। তবে এ ঘটনায় ঈশ্বরদী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়। হত্যার পর ঘাতক জিম ভিকটিমের ব্যবহৃত মোবাইল থেকে বান্ধবীকে কৌশলে ভুলবার্তা পাঠিয়ে মোবাইল ফোনটি বগুড়া রেল স্টেশনের পাশের পুকুরে ফেলে দেন।
নিহত নিঝুমের মা তাসলিমা খাতুন বলেন, আমার মেয়ে আর ফিরে আসবে না। ওরা আমার সব আশা ভরসা শেষ করে দিয়েছে। আমি চাই আমার মেয়ের খুনিদের ফাঁসি হক।
সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেলের উপপরিদর্শক ইখলাচুর রহমান বলেন, মামলার পর আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়।
ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার আশিস বিন হাসান বলেন, বাদীর অভিযোগের পর পুলিশ ও সাইবার ইনভেস্টিগেশন সেলের সমন্বয়ে রহস্য উদঘাটন করে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন।
