হিমেল খান
খুলনা বিভাগের ছয় জেলায় গত তিন মাসে পানিতে ডুবে অন্তত ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সাতজনের মৃত্যু হয়েছে যশোরে। এরপর সাতক্ষীরায় পাঁচজন, নড়াইলে তিনজন, মাগুরায় তিনজন, বাগেরহাটে দুজন এবং ঝিনাইদহে একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট জেলা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে।
সর্বশেষ গতকাল নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামের আল আমিন শেখের মেয়ে আফসানা খানম (৫) পুকুরের পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়। বুধবার দুপুরে লাহুড়িয়া ইউনিয়নের দিননাথ পাড়া গ্রামে তার নানা বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। মৃত আফসানা উপজেলার শালনগর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের আল আমিন শেখের মেয়ে।
বর্ষা মৌসুমে পুকুর, ডোবা, খাল-বিল, বাঁওড় ও অন্যান্য জলাশয়ে পানির পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি শিশুদের অবাধ চলাচল, অভিভাবকের সরাসরি নজরদারির বাইরে চলে যাওয়া এবং পানিতে নিরাপত্তা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাঁতার না জানা বা অদক্ষতার কারণে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে যাচ্ছে প্রাণহানি।
গত ২৩ আগস্ট যশোরের মণিরামপুরে পারখাজুরা বাঁওড়ে শাপলা ফুল তুলতে গিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু এ ঝুঁকিরই মর্মান্তিক উদাহরণ। উপজেলার মশ্বিমনগর ইউনিয়নের হাজরাকাটি গ্রামের কাছে বাঁওড়ের দক্ষিণ আগাড়ে দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা আপন চাচাতো ভাই-বোন—হাজরাকাটি গ্রামের অলিয়ার রহমানের ছয় বছর বয়সী মেয়ে ইয়াসমিন এবং একই গ্রামের মফিজুর রহমানের ১০ বছর বয়সী ছেলে জিসান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিবারের অজান্তে তারা দুজন বাঁওড়ে শাপলা ফুল তুলতে যায়। একপর্যায়ে একজন পানিতে পড়ে গেলে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে অপর শিশুটিও পানিতে তলিয়ে যায়। পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করেন। কিন্তু ততক্ষণে দুজনেরই মৃত্যু হয়।
খুলনা বিভাগের সাম্প্রতিক এই ২১ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় বসতবাড়ির কাছাকাছি থাকা পুকুর, ডোবা ও খাল শিশুদের জন্য স্থায়ী ঝুঁকির উৎস হয়ে থাকে।
বছরে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ মৃত্যু
বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ভয়াবহতা শুধু সাম্প্রতিক স্থানীয় ঘটনাগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২৫ জুলাই ২০২৬ প্রকাশিত তথ্যে জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক ৯ হাজার ৬০০ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। সংস্থাটির হিসাবে, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে পানিতে ডোবা মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অধিকাংশ পানিতে ডোবার ঘটনা বাড়ির ২০ মিটারের মধ্যে ঘটে। এসব দুর্ঘটনার প্রধান স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে পুকুর, ডোবা ও পানির অন্যান্য উৎস।
ডাব্লুএইচও’র মতে, শিশুদের বয়স কম হওয়ায় ঝুঁকি বোঝার সক্ষমতা ও সাঁতার শেখার সুযোগ সীমিত থাকে। সক্রিয় প্রাপ্তবয়স্কের নজরদারি ছাড়া শিশুরা পানির সংস্পর্শে গেলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বিশ্বব্যাপিও পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা; পাঁচ বছরের কম বয়সীরা মোট ডুবে মৃত্যুর প্রায় এক-চতুর্থাংশের জন্য দায়ী।
প্রতিরোধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা
বাংলাদেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু কমাতে জাতীয় পর্যায়েও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ডাব্লুএইচও’র ২০২৫ সালের আঞ্চলিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ন্যাশনাল ড্রাউনিং প্রিভেনশন স্ট্যাটেজি অ্যাণ্ড অ্যাকশন প্লান (২০২৫-২০৩০) অনুমোদিত হয়েছে এবং এতে শিশুদের জন্য কমিউনিটি চাইল্ড কেয়ার সেন্টার বা ‘আঁচল’, বেঁচে থাকার জন্য সাঁতার শেখানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে জরুরি উদ্ধার ও প্রাথমিক সেবার প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে ডাব্লুএইচও জানিয়েছে, এসব কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। সংস্থাটি বলেছে, পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে প্রমাণভিত্তিক কর্মসূচি-যেমন শিশুদের নিরাপদ পরিচর্যা, বেঁচে থাকার সাঁতার শিক্ষা এবং জরুরি সাড়া দেয়ার সক্ষমতা-গ্রাম ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে পৌঁছানো জরুরি।
ডাব্লুএইচও’র ২০২৬ সালের নতুন কারিগরি নির্দেশনায় পানিতে ডুবে মৃত্যু ঠেকাতে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপদ অবকাঠামো, উদ্ধার ও পুনরুজ্জীবন সক্ষমতা, পানির আশপাশে নিরাপত্তা, নৌযান নিরাপত্তা, শিশুদের সাঁতার ও পানি নিরাপত্তা শিক্ষা, নিরাপদ শিশুযত্ন এবং বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের প্রস্তুতি।
দুর্ঘটনার পর নয়, আগে প্রতিরোধ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু ঠেকাতে শুধু দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতা বাড়ালেই হবে না; ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয় চিহ্নিত করে দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বাড়ির আশপাশের পুকুর বা ডোবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিশুদের একা পানির কাছে যেতে না দেয়া, স্থানীয়ভাবে নিরাপদ সাঁতার শেখানো এবং জরুরি উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসায় প্রশিক্ষিত মানুষ তৈরি করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে পরিবারের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও কমিউনিটিকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বাড়ির কাছেই পুকুর, বাঁওড়, খাল বা বড় জলাশয় রয়েছে, সেসব এলাকায় শিশুদের জন্য নিয়মিত পানি নিরাপত্তা কর্মসূচি নেয়া প্রয়োজন।
খুলনা বিভাগে তিন মাসে ২১ শিশুর মৃত্যুর তথ্য তাই কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনার হিসাব নয়। এটি বর্ষা মৌসুমে শিশুদের পানি নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের আরও কার্যকর প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তার একটি সতর্কবার্তা। পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য-এ কারণে প্রতিটি দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি।
