হিমেল খান
টানা পাঁচ দিনের ভারি ও মাঝারি বর্ষণে যশোরে এক ভয়াবহ ও বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একদিকে জেলার মৎস্য ও কৃষি খাতে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়, অন্যদিকে যশোর পৌর শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় তলিয়ে গেছে হাজারো মাছের ঘের ও ফসলি জমি। একই সাথে শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অসংখ্য বাসিন্দা। মৎস্য ও কৃষি অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্য মতে, মৎস্য খাতেই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা।
এছাড়া অন্তত ৪৫০ হেক্টর জমির বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
যশোর বিমানবাহিনী মতিউর রহমান ঘাঁটির আবহাওয়া দফতর সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি সোমবার পর্যন্ত কখনও ভারি, কখনও মাঝারি আকারে অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বৃহস্পতিবার রাত ২টা থেকে শুক্রবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত রেকর্ড ১৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। এরপর সোমবার নতুন করে আরও ৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
শহরের নিম্নাঞ্চলে হাঁটু থেকে কোমর পানি, চরম ভোগান্তি
টানা বৃষ্টিতে যশোর শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও কপোতাক্ষ-ভৈরব নদের পানি ধারণক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় শহরের বিভিন্ন এলাকা এখন পানির নিচে। বিশেষ করে শহরের আরবপুর, চাঁচড়া, শংকরপুর, বারান্দীপাড়া, বেজপাড়া এবং খড়কিসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল ও বস্তি এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে।
এসব এলাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে কোথাও হাঁটু, আবার কোথাও কোমর সমান পানি জমেছে। বহু মানুষের ঘরের ভেতর বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়েছে। রান্নাঘর ও টয়লেট তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকট।
ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানান, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং শহরের খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণেই এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। শংকরপুর এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “ঘরের মধ্যে পানি ঢুকে খাট-পালঙ্ক সব ডুবে গেছে। তিন দিন ধরে রান্না বন্ধ। ছেলেমেয়েদের নিয়ে খাটের ওপর বসে দিন পার করছি।” চাঁচড়া ও আরবপুর এলাকার চিত্র আরও ভয়াবহ। সেখানকার কাঁচা ঘরবাড়িগুলো ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। রাস্তাঘাট তলিয়ে থাকায় জরুরি প্রয়োজনেও মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল কমে যাওয়ায় সাধারণ চাকরিজীবী ও দিনমজুরেরা পড়েছেন চরম বিপাকে।
মাছের ঘের ও পুকুর ভেসে চাষিদের মাথায় হাত
জেলার মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, যশোরের আটটি উপজেলায় টানা বৃষ্টির কারণে ২ হাজার ১৭টি মাছের ঘের, ২০৮টি পুকুর এবং ৩৮টি মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঘেরে উৎপাদিত চিংড়ি, রুই, কাতলা, মৃগেল, তেলাপিয়া, পাঙ্গাসসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পানিতে ভেসে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কেশবপুর, যশোর সদর, মণিরামপুর ও চৌগাছা উপজেলায়।
চুন্নু মিয়া নামের এক মৎস্যচাষী জানান, পাঁচ দিনের বৃষ্টিতে রাস্তা ও মাছের ঘেরের পানির স্তর সমান হয়ে গেছে। ফলে ঘেরের অধিকাংশ মাছ ভেসে গেছে। রবিউল ইসলাম নামের আরেক চাষী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শহরের জলাবদ্ধতার পানি নিস্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় সেই ময়লা পানি উপচে আমাদের মাছের ঘেরে ঢুকে একাকার হয়ে গেছে। আমাদের সব শেষ।”
ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা জানান, বছরের শুরুতে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা ঘের প্রস্তুত করেছিলেন। এখন সব মাছ ভেসে যাওয়ায় ঋণের কিস্তি কীভাবে শোধ করবেন, তা নিয়ে তারা দিশেহারা। তারা দ্রুত সরকারি আর্থিক সহায়তা এবং স্বল্পসুদে ঋণের দাবি জানিয়েছেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, সোমবার পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করে প্রায় ৫৫ কোটি টাকার প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে। তবে অনেক এলাকায় এখনও তথ্য সংগ্রহ চলমান রয়েছে। পানি দ্রুত না নামলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
৪৫০ হেক্টর ফসলি জমি ও বিজতলা নষ্ট
মৎস্য খাতের পাশাপাশি বড় ধাক্কা খেয়েছে জেলার কৃষি খাতও। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৪৫০ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লাউ, বেগুন, মরিচ, ঢেঁড়স, পেঁপেসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজি।
দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষেতে পানি জমে থাকায় গাছের শিকড় পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সবজির চারা সরবরাহের জন্য বিখ্যাত যশোরের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের অধিকাংশ বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে লাখ লাখ টাকার আগাম সবজির চারা নষ্ট হয়েছে।
আব্দুল্লাহপুর গ্রামের চারা উৎপাদনকারী কৃষক সোহেল হোসেন ও আমীন উদ্দিন জানান, ভারি বর্ষণে কোথাও বিজ পচে গেছে, আবার কোথাও সদ্য গজানো চারা পচে শেষ হয়ে গেছে। ফলে তাদের নতুন করে আবার বিজ রোপণ করতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
কৃষক আলামীন বলেন, “পানি নিস্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বর্ষাতেই আমাদের এই অভিশাপ সহ্য করতে হয়। এর ফলে প্রতি বছর শত কোটি টাকার লোকসান গুণতে হয়, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে সবজির বাজারে।”
প্রশাসনের বক্তব্য
যশোর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকারের কাছে দ্রুত সহায়তার সুপারিশ পাঠানো হবে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, জেলার অর্থনীতিতে মৎস্য ও কৃষি খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে শহরের ভেতরের এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও মানবিক সংকট জেলার সামগ্রিক অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে স্থবির করে দিচ্ছে। দ্রুত শহরের পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা, খাল পুনখনন এবং ক্ষতিগ্রস্ত চাষি ও বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ না নিলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
