বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালক)-এ বর্তমানে ২৯৫ জন শিশু রয়েছে। এর মধ্যে ১৬ জনের বয়স ইতোমধ্যে ১৮ বছর অতিক্রম করেছে। একই সঙ্গে হত্যা মামলার আসামি হিসেবে রয়েছে ১০৮ শিশু। আইন কমিশনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। প্রতিবেদনে শিশু আদালতে বিচারক সংকট, দীর্ঘসূত্রিতা এবং শিশু আইনের বিভিন্ন অসঙ্গতিকে এ অবস্থার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা যায়, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালক) বর্তমানে ধারণক্ষমতার প্রায় পুরোটা পূর্ণ হয়ে গেছে। ৩০০ জন ধারণক্ষমতার এ কেন্দ্রে অবস্থান করছে ২৯৫ জন শিশু। তাদের মধ্যে ১৬ জনের বয়স ১৮ বছর অতিক্রম করেছে। এছাড়া ৬৯ জনের বয়সের তথ্য নথিতে উল্লেখ নেই। বাকি শিশুদের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে।
সম্প্রতি প্রকাশিত আইন কমিশনের ‘শিশু আইন, ২০১৩: সংশয়, অসঙ্গতি ও বিভ্রান্তি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। শিশু আইন বাস্তবায়নের অবস্থা পর্যালোচনার অংশ হিসেবে কমিশন যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রসহ দেশের বিভিন্ন শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র ও সেফ হোম পরিদর্শন করে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা ২৯৫ শিশুর মধ্যে ১০৮ জন হত্যা মামলার আসামি। এছাড়া বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের অভিযোগেও আরও অনেক শিশু সেখানে রয়েছে।
এদিকে দেশের তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের চিত্র বিশ্লেষণ করে আইন কমিশন জানিয়েছে, বর্তমানে গাজীপুরের বালিকা কেন্দ্রে একজন, গাজীপুর বালক কেন্দ্রে ৫৩ জন এবং যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে ১৬ জনসহ মোট ৭০ জনের বয়স ১৮ বছর অতিক্রম করেছে, অথচ তারা এখনো শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রেই অবস্থান করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশু আদালতে বিচারক সংকট, মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে অনেক শিশু মামলার নিষ্পত্তির আগেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে যাচ্ছে। আইন অনুযায়ী অপরাধ সংঘটনের সময় কেউ শিশু হলে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে শিশু হিসেবেই গণ্য করা হয়। ফলে বয়স ১৮ বছর অতিক্রম করলেও আদালতের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত তাদের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রেই থাকতে হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ব্যারিস্টার কুমার দেবুল দে বলেন, অপরাধ সংঘটনের সময় অভিযুক্তের বয়স যদি ১৮ বছরের নিচে থাকে, তাহলে বহু বছর পর বিচার হলেও তাকে শিশু হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। তবে যাদের বয়স অনেক বেশি হয়ে গেছে, তাদের সংশোধনাগারের ভেতরে আলাদা ব্যবস্থায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
আইন কমিশন আরও বলেছে, শিশু আইন-২০১৩ কার্যকরের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা এখনো প্রণয়ন হয়নি। প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গেলেও বিধিমালা না থাকায় আইনটির অনেক ধারা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি শিশু আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি, বিচারক নিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আইনের বিভিন্ন ধারা সংশোধনের সুপারিশ করেছে কমিশন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোকে শুধু আটক রাখার স্থান নয়, বরং পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিশুদের সমাজে ফিরিয়ে আনার উপযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে যশোরের মতো বড় কেন্দ্রগুলোতে বিচার বিলম্ব কমানো এবং পৃথক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে আইন কমিশন।

