বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
যশোরের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রুকুনউদ্দৌলাহর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০২৫ সালের এই দিনে সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিটে যশোরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সময়ের সঙ্গে লড়ে চলা এই প্রবীণ সাংবাদিক। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তিনি স্ত্রী, একমাত্র কন্যা সুম্মিতা দৌলা মিষ্টিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
রুকুনউদ্দৌলাহ দৈনিক সংবাদের যশোরস্থ বিশেষ প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি পাক্ষিক ‘যশোরের কাগজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং দৈনিক কল্যাণের উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দৈনিক কল্যাণের সম্পাদক ও প্রকাশক বীর মুক্তিযোদ্ধা একরাম-উদ-দ্দৌলার অনুজ এবং দৈনিক কল্যাণের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এহসান-উদ-দৌলা মিথুনের চাচা।
তার মৃত্যুবার্ষিকীতে পারিবারিক উদ্যোগে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, মাদ্রাসার এতিম শিশুদের খাবার প্রদান করা হবে। এছাড়া কারবালা কবরস্থানে তার সমাধিতে মুক্তিযোদ্ধা পাঠাগারের উদ্যোগে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হবে।
১৯৫৬ সালের ২০ মার্চ ভারতের ২৪ পরগনা জেলার বাদুড়িয়া থানার কলিঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রুকুনউদ্দৌলাহ। নওগাঁ সরকারি কেডি বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, যশোর সরকারি সিটি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং সরকারি এমএম কলেজ, যশোর থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে নওগাঁয়। সেখানে তিনি অগ্রজ আসফউদ্দৌলার কাছে থাকতেন। নওগাঁ কেডি স্কুলে পড়াকালীন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে রাজনৈতিক সচেতন রুকুনউদ্দৌলাহ পরিবারের সঙ্গে ভারতে চলে যান। শিলিগুড়িতে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
ধর্ম, মানবতা ও সাংবাদিকতার বাইরে অন্য কোনো পেশায় তিনি যুক্ত হননি। দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীনতম সংবাদপত্র দৈনিক সংবাদের সঙ্গে চার দশকেরও বেশি সময় যুক্ত ছিলেন। সংবাদে তাঁর নিয়মিত কলাম ‘গ্রাম-গ্রামান্তরে’ পাঠকমহলে বেশ জনপ্রিয় ছিল।
তিনি চ্যানেল আই ও রেডিও টুডেতেও কাজ করেছেন। যশোর থেকে প্রকাশিত দৈনিক স্ফুলিঙ্গ, দৈনিক ঠিকানা, দৈনিক রানার ও দৈনিক কল্যাণে দীর্ঘদিন বার্তা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ তিনি পাক্ষিক ‘যশোরের কাগজ’-এর উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি প্রেসক্লাব যশোর ও যশোর সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন।
সাংবাদিকতা পেশায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রুকুনউদ্দৌলাহ আইডিই পুরস্কার, যশোর শিল্পী গোষ্ঠী পদক, জ্ঞানমেলা পদক ও বজলুর রহমান স্মৃতিপদকসহ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একাধিক বই লিখেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘গ্রাম-গ্রামান্তরে’, ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর’, ‘আমার কৈশোর আমার মুক্তিযুদ্ধ’, ‘মানুষের ভাবনা মানুষের কথা’, ‘ছোট ছোট কথা অচেনা মানুষ’, ‘জনতার গভর্নর’, ‘দেশ জনতার খণ্ডচিত্র’, ‘রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা’, ‘গাঁও গেরামের কথা’, ‘যশোর রোড ১৯৭১’ ও ‘হাতাহাতি যুদ্ধ ১৯৭১’। ‘আমার কৈশোর আমার মুক্তিযুদ্ধ’ বইটির ইংরেজি সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে।
পারিবারিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্যন্ত্র ও কিডনিজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। গত ২৭ জুলাই গুরুতর অসুস্থ হয়ে ঢাকার ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে দেশবরেণ্য চিকিৎসক অধ্যাপক এম এ রশীদের তত্ত্বাবধানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন। ১৯ আগস্ট তাঁর হৃদ্যন্ত্রে তিনটি রিং স্থাপন করা হয়। চিকিৎসা শেষে ২১ আগস্ট তিনি যশোরে ফিরে আসেন।
পরদিন ২২ আগস্ট সন্ধ্যায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে নেয়া হয়। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তিনি মারা যান।
রুকুনউদ্দৌলাহর মৃত্যুতে যশোরের সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। তাঁর মৃত্যুতে সাংবাদিকতা অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

