বাংলার ভোর প্রতিবেদক
সাত বছর পর দেশে আবারও শনাক্ত বার্ড ফ্লু। সীমাস্তবর্তী জেলা যশোর সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারে অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়েছে। ঈদের আগে নতুন করে এই ফ্লু শনাক্ত হওয়ায় উদ্বেগ বাড়িয়েছে খামারিদের মাঝে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ১২ মার্চ খামারে মুরগি মারা যাওয়ায় নমুনা ঢাকার ল্যাবে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় রিপোর্ট পজিটিভ হলে ১৩ মার্চ খামারের ৬টি শেডের দুই সহস্রাধিক মুরগি মেরে পুতে ফেলা হয়। একই সাথে শেড খালি করে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিস্কার করা হয়েছে। তবে আতংকিত না হয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন প্রাণি সম্পদ বিভাগ।
জানতে চাইলে যশোর জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাশেদুল ইসলাম বলেন, গত ১৩ মার্চ ল্যাব টেস্টের রিপোর্ট পাওয়ার পর খামারের ৬টি শেডের দুই হাজার ৭৮টি মুরগি মেরে পুতে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে খামারে কোন মুরগি নেই। শেডগুলো খালি করে জীবাণুনাশক দিয়ে পরিস্কার করা হয়েছে। খামারিদের আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। সতর্কতা অবলম্বন করার জন্য পরামর্শ দিচ্ছি। তিনি আরও বলেন, সরকারি খামারের বাইরে ময়লা ফেলার জায়গা আছে। এছাড়া খামারে পাখির আনাগোনা থাকে। এসব মাধ্যমে বার্ড ফ্লু ভাইরাস ছড়াতে পারে। তবে নিশ্চিত নই কোন মাধ্যমে সংক্রমিত হয়েছে। আতংকিত না হয়ে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। একই সাথে কোন খামারে মুরগি মারা গেলে ল্যাব টেস্টে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে।’
বাংলাদেশে খামারে ২০০৭ সালে প্রথম এবং ২০১৮ সালে সর্বশেষ বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়। আর যশোর জেলায় এক হাজার ৭৫৩ টি ব্যক্তি মালিকানাধীন হাঁস মুরগির খামার রয়েছে। সাত বছর পর আবারও বাংলাদেশে এই ফ্লু শনাক্ত হওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে খামারিদের মাঝে। তারা বলছেন, সরকারি খামারের মতো ইতোমধ্যে জেলায় ব্যক্তিমালিকানা খামারেও এই ফ্লুর প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন প্রাদুর্ভাবের কারণে খামারিদের আর্থিক ক্ষতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। যদি সরকার দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আরও খামার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এটি দেশের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
শহরের শংকরপুর এলাকার এসএম এগ্রো ফার্ম এন্ড হ্যাচারির মালিক মাহাদী হাসান বলেন, ‘১৫ দিন আগে আমার ফার্মে বার্ড ফ্লু দেখা দেয়। কিছু মুরগি ও বাচ্চাও মারা যায়। তাক্ষৎনিক ব্যবস্থা ও পরিচর্যা নেয়াতে অনেকটা রোধ করা গেছে। যশোরের ব্যক্তিমালিকানায় অন্যতম বড় খামিরা সদর উপজেলার ভাতুড়িয়ার আলাউদ্দিনের। তার খামারে ১০ হাজার মুরগি রয়েছে। তার ভাষ্য, কখনো শীত ও কখনো প্রচণ্ড গরমে মুরগি পালনে নানা বেগ পেতে হচ্ছে। গরমে তো নানা রোগ দেখা যায়। এর মধ্যে নতুন করে এলাকায় দেখা গেছে বার্ড ফ্লু। এতে অনেক চিন্তিত। আশরাফুল আলম নামে আরেক খামারি বলেন, ‘ছয় হাজার মুরগি রয়েছে খামারে। গাম্বুরা, রানিখেতসহ নানা ভাইসরাস রোগে মুরগি নিয়ে চিন্তায় রয়েছি। এর মধ্যে কিছুদিন আগে কিছু মুরগি মারা গেছে। আক্রান্ত এলাকাগুলোর দ্রুত তদারকি করে রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান এ খামারি। একই সাথে খামারিদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের সঙ্গে টিকাদান কর্মসূচি চালু করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে, বুধবার বিকেলে ঢাকায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে যশোরে বার্ড ফ্লু শনাক্তের খবর প্রকাশ্য আনেন। ওই সময়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, গত ১২ মার্চ যশোরের সরকারি খামারে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়েছে। আমরা যে নমুনা পেয়েছি তা পরীক্ষার জন্য দেশের বাইরে পাঠাবো। তবে মৃদু আকারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আমরা সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি পোলট্রি খামারকে নির্দেশনা দিয়েছি। একই সঙ্গে পোলট্রি খামারিদের সংগঠনকেও আমরা সতর্ক থাকতে বলেছি। যাতে তারা পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, ভ্যাকসিন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিশ্চিত করেন।
তিনি আরও বলেছেন, স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় সীমান্ত এলাকায় আমাদের কার্যালয়গুলোকে সতর্ক করতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিশেষায়িত ভ্যাকসিন পর্যাপ্ত আছে। বাংলাদেশে খামারে ২০০৭ সালে প্রথম এবং ২০১৮ সালে সর্বশেষ বার্ড ফ্লু শনাক্ত হয়। এবার আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এবারের পরিস্থিতি অন্যবারের মতো না। বার্ড ফ্লু নিয়ে যেন অনাকাক্সিক্ষত ভুল বোঝাবুঝি বা প্রচারণা না ছড়ায়, সেদিকে যেন আমরা সতর্ক থাকি। খামারি বা ক্রেতার আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ক্রেতাসাধারণকে অনুরোধ করব, আতঙ্কিত হয়ে আপনারা হাঁস-মুরগি বা ডিম খাওয়া বন্ধ করবেন না।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার বলেন, আমাকে মার্চের শুরুতে বার্ড ফ্লু শনাক্তের বিষয়টি জানানো হয়েছে। ফ্লুর বিস্তার যাতে বাড়তে না পারে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং এই ফ্লু বিস্তার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যশোরের খামারটি পরিদর্শন করেছেন এবং ফ্লুটি কীভাবে বাংলাদেশে এসেছে, তার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ফ্লুর পরীক্ষাবিষয়ক টেকনিক্যাল বিষয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলতে পারবেন।
২০০৭ সালের মার্চে বাংলাদেশে প্রথম বার্ড ফ্লু দেখা দেয়। সে বছর ১০ লাখেরও বেশি মুরগি এই ফ্লুয়ের কারণে মের ফেলা হয়। ২০০৮ সালের মে মাসে বাংলাদেশে মানুষের শরীরে বার্ড ফ্লু সংক্রমণ ধরা পড়ে। দেশে মাংসের মোট চাহিদার অর্ধেকের বেশি জোগান দেয় পোলট্রি খাত। পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তারা বলেন, দেশে ৯৫ হাজার ৫২৩টি খামার আছে।
ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ ও ডলার সংকটে বেড়ে গেছে প্রাণিজ খাদ্যের দাম। করোনার পর থেকে খরচ সামলাতে না পেরে বন্ধ হয়ে গেছে ৬২ হাজার ৬৫৬টি খামার। এবার বার্ড ফ্লু যেন দেশের খামারিদের আরেকটি মহামারিতে না ফেলে, এ জন্য ফ্লু বিস্তার রোধে সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে পোল্ট্রিখাত বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।