নড়াইল সংবাদদাতা
নড়াইলের মেধাবী শিক্ষার্থী পূজা বিশ্বাস (১৬)। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় নড়াইল সদর উপজেলার কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। জেলার সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েও মেডিকেল পড়ার স্বপ্নে অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে এ মেধাবীর। পূজার বাড়ি নড়াইল সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের নলদিচর গ্রামে। তার বাবা নৃত্য গোপাল বিশ্বাস পেশায় কৃষক, মা দীপ্তি রানী বিশ্বাস গৃহিণী।
পূজা বিশ্বাস বলেন, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাই। চিকিৎসক হয়ে গরীব মানুষের সেবা করতে চাই। আমার মতো অস্বচ্ছল গরীব শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে চাই। তবে বাবা-মা আমাকে মেডিকেল পড়াতে পারবেন কি না, জানি না। তাদের পক্ষে এত খরচ বহন করা কঠিন। তবু তাদের পরিশ্রম, আমার শিক্ষকদের সহযোগিতা আর নিজের চেষ্টাতেই আজকের এই ফল অর্জন করেছি।
জানা গেছে, ৫ শতাংশ জমির ওপর ছোট একটি বসতভিটাই পরিবারের একমাত্র সম্বল। কৃষিকাজ করেই চলে সাত সদস্যের সংসার। বছরের অধিকাংশ সময়ই অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করতে হয় পরিবারটির। সেই বাস্তবতার মধ্যেও পড়াশোনা থামিয়ে দেয়নি পূজা। তিন ভাই বোনের মধ্যে পূজা বড়। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি তার ছিল প্রবল আগ্রহ। বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী হওয়ার পাশাপাশি বাড়িতে সুযোগ পেলেই বই নিয়ে বসত সে। বিদ্যুৎ চলে গেলে কখনো চার্জলাইট, কখনো কেরোসিনের বাতির আলোয় পড়াশোনা করেছে। শিক্ষক ও পরিবারের উৎসাহই তাকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
পূজার স্বপ্ন একজন চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করা বিশেষ করে গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় মানুষ, যারা অর্থের অভাবে সময়মতো চিকিৎসা পান না, তাদের জন্য কাজ করতে। কিন্তু এসএসসিতে ভালো ফল করলেও সামনে কলেজ ভর্তি কোচিং এবং পরে মেডিকেল পড়ার ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে পরিবার। পূজা বলে, বাবা- মা আমাকে মেডিকেল পড়াতে পারবেন কি না, জানি না। তবু চেষ্টা চালিয়ে যেতে চাই।
এদিকে মেয়ের এমন সাফল্যে গর্বিত হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না পূজার বাবার। কৃষি কাজ করে কোনমতে সাত সদস্যোর সংসার চালাতে হয় তাকে। তাই মেয়ের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজনীয় খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন, সেটিই এখন তার সব চেয়ে বড় উদ্বেগ।
পূজার বাবা নৃত্য গোপাল বিশ্বাস বলেন, আমার মেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। আমি একজন কৃষক। অনেক কষ্ট করে সংসার চালাই। মেয়েটার পড়াশোনার ইচ্ছে খুব বেশি। যতটুক পেরেছি তাকে পড়িয়েছি। মেয়েটার মেডিকেল পড়ার ইচ্ছে। আমিও তার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। কিন্তু মেডিকেল পড়ানোর খরচ মেটানো আমার পক্ষে কঠিন। সমাজের বিত্তবান মানুষ বা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি পাশে দাঁড়ায়, তাহলে আমার মেয়ের স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।”
পূজার মা দীপ্তী রানী বলেন, মেয়েটার স্বপ্ন সে ডাক্তার হবে। আমি চাই তার স্বপ্ন পূরণ হক। আমরা গরীব মানুষ, কতদূর কি করতে পারব জানিনা। আমাদের ইচ্ছে আছে সে যতদূর পড়তে চায় আমরা তার পড়ালেখা চালিয়ে যাব।
অভাবের সংসার হলেও মেয়েকে কখনো পড়াশোনা ছাড়তে বলিনি। ও অনেক কষ্ট করে পাস করেছে। এখন শুধু চাই ও যেন লেখাপড়া চালিয়ে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে।”
কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই প্রতিটি শ্রেণিতে ভাল ফল করে আসছিল পূজা। নিয়মিত উপস্থিত, পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ এবং শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চলার কারণে শুরু থেকেই তাকে নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রত্যাশা ছিল।
প্রধান শিক্ষক সমীর গোলদার বলেন, ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির পর থেকে তার মেধার প্রকাশ ফুটে উঠেছিল। সে জেলার সর্বোচ্চ নাম্বারধারী শিক্ষার্থী। সে ১২৫০ নম্বরের মধ্যে ১২১০ পেয়েছে। এটা জেলার সর্বোচ্চ নম্বর। আমাদের স্কুলটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। এখানে অনেকে ভর্তি হয়না। বিদ্যালয়টির সভাপতি বিদ্যুৎ স্যানাল এই বিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ অবৈতনিক ঘোষণা করায় গ্রামের মেয়েরা এখানে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। পূজা মেয়েটি গরীব পরিবারের মেয়ে। তার মেধা দেখে আমাদের তাকে নিয়ে স্বপ্ন ছিল। তার চেষ্টায় ও শিক্ষকদের আন্তরিকতার কারণে আজ সে জেলার সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে।
কৃষ্ণলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বিদ্যুৎ কুমার স্যানাল বলেন, একটি প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার বিদ্যালয় থেকেও যে কঠোর পরিশ্রম, মেধা, অধ্যবসায় ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে ঈর্ষণীয় ফলাফল অর্জন করা সম্ভব পূজা বিশ্বাসের এই অসাধারণ সাফল্য তারই উজ্জ্বল প্রমাণ। একই সঙ্গে আমি আহ্বান রাখি পূজা বিশ্বাসের সাফল্যকে অনুপ্রেরণা হিসাবে গ্রহণ করে বিদ্যালয়ের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ছাত্রীরা আরো বড় সাফল্য বয়ে আনবে।
উল্লেখ্য, গত ১০ আগস্ট এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। যশোর বোর্ডের ফলাফলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নড়াইল জেলা থেকে এবার মোট ৮ হাজার ২৬২ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। জেলায় মোট জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে শিক্ষাবোর্ডের (সাধারণ) জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৭০ জন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৮ জন।

