বাংলার ভোর প্রতিবেদক
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টার পর দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে যশোর শহরে। নির্ধারিত সময়ের পর প্রকাশ্যে দোকান খোলা না রেখে অভিনব কৌশলে চলছে বেচাকেনা। কোথাও দুই পাশের শাটার নামিয়ে মাঝের গেট খোলা রাখা হয়েছে, কোথাও অর্ধেক শাটার নামিয়ে ক্রেতা পরিচয় দিলেই ভেতরে ঢোকানো হচ্ছে। আবার কোনো কোনো দোকানের সামনে কর্মচারী দাঁড় করিয়ে রেখে সংকেতের মাধ্যমে ক্রেতা ঢুকিয়ে শাটারের আঁড়ালে চলছে কেনাকাটা। একই সাথে জ্বলতে দেখা গেছে বিজ্ঞাপনী প্রচারের বিলবোর্ডও।
সোমবার রাত ৮টার পর যশোর শহরের বিভিন্ন বিপণিবিতান, মার্কেট ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় সরেজমিন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বাইরে থেকে অনেক দোকান বন্ধ মনে হলেও ভেতরে জ্বলছে বিদ্যুতের বাতি, চলছে ফ্যান ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। একই সঙ্গে দোকানের ভেতরে ক্রেতাদের পণ্য দেখানো ও বিক্রির কার্যক্রমও চলতে দেখা যায়। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে নেয়া সরকারি সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শাটার নামিয়ে ‘গোপন’ বেচাকেনার চিত্র দেখা যায়, মুজিব সড়ক, দড়াটানা, মাইকপট্টি ও শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায়। রাত ৮টার পর দোকানগুলোর সামনে দেখা যায় ভিন্ন কৌশল। কোনো দোকানের দুই পাশের শাটার পুরোপুরি নামানো হলেও মাঝের গেট খোলা রাখা হয়েছে। ক্রেতা এলে ওই গেট দিয়ে তাকে ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। কেনাকাটা শেষ হলে আবার গেট বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।
কোনো কোনো দোকানে অর্ধেক শাটার নামিয়ে তার নিচ দিয়ে ক্রেতাদের ভেতরে প্রবেশ করানো হচ্ছে। আবার কিছু দোকানের সামনে কর্মচারী দাঁড়িয়ে থেকে পাহারা দিচ্ছেন। অপরিচিত কেউ এলে দোকান বন্ধ বলে জানানো হলেও পণ্য কেনার কথা জানালেÑ সংকেত পেয়ে শাটার তুলে তাকে ভেতরে নেয়া হচ্ছে। এরপর শাটার নামিয়ে দিয়ে চলছে স্বাভাবিক বেচাকেনা।
সরেজমিনে একাধিক এলাকায় একই চিত্র
সোমবার রাতে মুজিব সড়কের ব্রাদার, এপ্রেক্স, রং, বিলাই ঘর, উদ্যান, আনজেন, আরাধ্য, ইজি ফ্যাশন, রিচম্যান, গ্লোরিয়াস, ইনফিনিটি, রিগাল ও ইরানি বোরকাসহ বিভিন্ন দোকানে এমন চিত্র দেখা যায়। একইভাবে জজ কোর্ট মসজিদ মার্কেট, কালেক্টরেট মসজিদ মার্কেট, জেলা পরিষদ শপিং মার্কেট, জেলা পরিষদের সামনের মার্কেট এবং ওরিয়ন সুপার শপের দুই আউটলেটেও রাত ৮টার পর দোকানের ভেতরে বেচাকেনা চলতে দেখা গেছে। এছাড়া দড়াটানা এলাকায় আরএফএল-এর দোকান এবং মাইকপট্টি এলাকার ব্যাগ ও ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকানেও একইভাবে শাটারের আঁড়ালে বেচাকেনা চলতে দেখা যায়।
সরকারি নির্দেশনা মেনে রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ করছেন এমন কয়েকজন ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা নিয়ম মেনে ব্যবসা বন্ধ করলেও অনেকে শাটার নামিয়ে ভেতরে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে একদিকে সরকারি সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে নিয়ম মেনে চলা ব্যবসায়ীরাও অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, রাতে পরিচিত ক্রেতারা এলে অনেক সময় তাদের পণ্য দিতে হয়। তবে শাটারের আড়ালে এভাবে ব্যবসা চালানো যে সরকারি নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেটিও তারা স্বীকার করেন।
পথচারি সালমান, আমজাদ বলেন, প্রকাশ্যে দোকান খোলা রাখলে প্রশাসনের নজরে পড়ার আশঙ্কা থাকায় ব্যবসায়ীরা এখন নতুন কৌশলে বেচাকেনা করছেন। এতে সরকারি নির্দেশনা যেমন উপেক্ষিত হচ্ছে, তেমনি যারা নিয়ম মেনে রাত ৮টার পর দোকান বন্ধ করছেন, তাদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
একইভাবে শহরের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত কোম্পানির বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড জ্বলতে দেখা যায় গভীর রাত পর্যন্ত। শহরের মণিহার এলাকায় রাতে পৌনে এগারটায়ও জ্বলছিল এস আলম স্টিলের একটি বিশাল বিলবোর্ড।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, রাতের দিকে ক্রেতা আসায় অনেক সময় পরিচিত ক্রেতাদের পণ্য দিতে হয়। তবে তারা স্বীকার করেন, এভাবে দোকান খোলা রেখে ব্যবসা করা সরকারি নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শহরের বাসিন্দা জাহিদ শেখ ও আলিফ হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ সংকট ও সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে সরকার যখন নির্দিষ্ট সময়ের পর দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন শাটারের আঁড়ালে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকলে পুরো উদ্যোগই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। নিয়ম মানতে সবাইকে বাধ্য করতে হলে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান বাড়াতে হবে।
অভিযোগ রয়েছে, রাত ৮টার পর নিয়মিত নজরদারি না থাকায় শহরের বিভিন্ন এলাকায় এভাবে দোকান চালানোর প্রবণতা বাড়ছে। শাটার বন্ধ থাকায় বাইরে থেকে সহজে বোঝাও যায় না যে ভেতরে ব্যবসা চলছে। ফলে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও সক্রিয় ভূমিকার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী।
যশোর পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা উত্তম কুমার জানান, শহরের মাইকিং করা হয়েছে। রাত আটটার পর মার্কেট ও দোকান-পাট বন্ধ রাখাতে।’

