শরিফুল ইসলাম
যশোর শহরে দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে যানজট সমস্যা। নগরীর প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে প্রায় প্রতিদিনই দীর্ঘ সময় আটকে থাকছে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। এতে করে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে শহরের প্রাণকেন্দ্র মণিহার মোড় থেকে মুড়লি মোড় পর্যন্ত চার লেনের সড়কের অর্ধেকই দখল হয়ে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল ও অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
শহরের দড়াটানা, চৌরাস্তা, চিত্রা মোড়, জেনারেল হাসপাতাল মোড়, মণিহার মোড় ও মুড়ুলি মোড়-প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টেই এখন যানজট নিত্যদিনের চিত্র। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এসব এলাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কোনো কোনো সময় কয়েকশ’ মিটার সড়ক পাড়ি দিতে সময় লেগে যাচ্ছে ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর্যন্ত। ফলে কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে।
এ বিষয়ে ট্রাফিক ইনসপেক্টর-১ মীর শরিফুল হক বলেন, যশোর পৌরসভা ও পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় খুব শিগগিরই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। “আমরা খুব দ্রুত এ ব্যাপারে অ্যাকশনে যাচ্ছি। আশা করি, অল্প সময়ের মধ্যেই যশোরবাসী যানজটমুক্ত শহর দেখতে পাবেন,”যোগ করেন তিনি।
শুধু দিনের বেলাতেই নয়, রাতে যানজট পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। রাত ১০টার পরও শহরের বিভিন্ন সড়কে যানজট লেগেই থাকে। বিশেষ করে মণিহার মোড়, চিত্রা মোড় ও জেনারেল হাসপাতাল এলাকার সড়কে রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত যানবাহনের চাপ দেখা যায়। এতে করে রাতে জরুরি কাজে বের হওয়া মানুষ কিংবা দূরপাল্লার যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়।
সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা দেয় মণিহার মোড় থেকে মুড়ুলি মোড় সড়কে। চার লেনের এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের দুই লেনই বিভিন্নভাবে দখল হয়ে থাকায় কার্যত দুই লেন দিয়েই সব ধরনের যান চলাচল করে। রাস্তার পাশে অবৈধ পার্কিং, হকারদের দখল, দোকানের মালামাল ফেলে রাখা এবং ইজিবাইক, রিকশা ও ভ্যানের অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে ওঠার কারণে চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে করে সামান্য যানবাহনের চাপ বাড়লেই তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট।
বিশেষ করে মণিহার এলাকায় নড়াইল স্ট্যান্ডের বাসগুলো দাঁড়িয়ে থাকা এবং যাত্রী ওঠানামার কারণে ওই এলাকায় সবচেয়ে বেশি জনদুর্ভোগ তৈরি হচ্ছে। সড়কের বড় একটি অংশ জুড়ে এসব বাস অবস্থান নেয়ায় যান চলাচল আরও ধীর হয়ে পড়ে এবং প্রায়ই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে প্রশাসনের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যশোরের সাধারণ জনগণ।
এ ছাড়া শহরে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক, রিকশা ও ভ্যানের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়াও যানজট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা রুট না মেনে এসব যানবাহন চলাচল করায় সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, ফুটপাতগুলো দখল হয়ে থাকায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে সড়কে নেমে চলাচল করছেন, যা যানজটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যানজটের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীরা। অনেক সময় জরুরি সেবার গাড়ি, এমনকি অ্যাম্বুলেন্সও নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না। এতে করে রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা সময়মতো স্কুল-কলেজে পৌঁছাতে না পেরে ক্লাস মিস করছে, আর অফিসগামীদের নিয়মিত দেরি হওয়ায় কর্মক্ষেত্রেও প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাঝে মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে অবৈধ দখল উচ্ছেদের চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারছে না। কিছুদিন পর আবার আগের মতোই সড়ক দখল হয়ে যায়। ফলে সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।
এ বিষয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ মোরাদ আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, শহরের অভ্যন্তরের অবৈধ দখল ও যানজট নিরসনের দায়িত্ব পৌরসভার। তবে মণিহার মোড় থেকে মুড়লি মোড় পর্যন্ত সড়কটি হাইওয়ে পুলিশের আওতাধীন হওয়ায় সে অংশের দায়িত্ব তারা দেখবে।
তিনি আরও বলেন, “শহরের অভ্যন্তরে খুব শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। ইতোমধ্যে কিছু অবৈধ ইজিবাইক আটক করা হয়েছে। যানজট নিরসনে আমরা ধারাবাহিকভাবে এ অভিযান চালিয়ে যাবো।”
শহরবাসীর দাবি, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ। অবৈধ দখল উচ্ছেদ, যানবাহনের সংখ্যা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড নির্ধারণ এবং কঠোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারীদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যশোর শহরের যানজট পরিস্থিতি ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

