বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
রঙিন, আকর্ষণীয় আর কম দামের প্লাস্টিকের খেলনা শিশুদের কাছে আনন্দের উপকরণ হলেও এর আঁড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি। যশোরের বাজারে অবাধে বিক্রি হওয়া অনেক মানহীন প্লাস্টিকের খেলনায় ব্যবহৃত হচ্ছে সিসা, ক্যাডমিয়াম ও থ্যালেটসের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক, যা শিশুদের মস্তিস্কের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদে নানা জটিল রোগের কারণ হতে পারে। এর পাশাপাশি ছোট খেলনা বা খেলনার বিচ্ছিন্ন অংশ গিলে শ্বাসরোধের মতো প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখনই বাজার তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা জরুরি।
সরেজমিনে যশোর শহরের বিভিন্ন ফুটপাত ঘুরে দেখা যায়, অতি কম দামে বিক্রি হচ্ছে নানা ধরনের প্লাস্টিকের খেলনা। অধিকাংশ খেলনায় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, নিরাপত্তা মান বা মান নিয়ন্ত্রণের কোনো তথ্য নেই। দাম কম হওয়ায় অনেক অভিভাবক এসব খেলনা কিনলেও এর স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে তাদের ধারণা সীমিত।
বেজপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও দুই সন্তানের মা শারমিন আক্তার বলেন, ‘আগে শুধু কম দাম দেখেই খেলনা কিনতাম। পরে জানতে পারি অনেক প্লাস্টিকের খেলনায় ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকে। এখন ভালো মানের খেলনা কেনার চেষ্টা করি, কিন্তু সেগুলোর দাম অনেক বেশি।’
উপশহর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, ‘ছোট বাচ্চারা খেলনা মুখে দেয়, তাই এখন খেলনা কেনার সময় অনেক সতর্ক থাকতে হয়। সরকার যদি নিম্নমানের খেলনা বিক্রি বন্ধে কঠোর হয়, তাহলে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা অনেক কমবে।’
বড় বাজারে খেলনা ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বেশিরভাগ ক্রেতাই কম দামের খেলনা চান। তবে এখন অনেকেই খেলনার মান ও নিরাপত্তা সম্পর্কেও জানতে চান।’
চৌরাস্তা এলাকার ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, আমরা সব পণ্যের মান পরীক্ষা করার সুযোগ পাই না। আমদানি ও বাজারজাতের সময় কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ হলে নিম্নমানের খেলনা অনেকটাই কমে যাবে।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নমানের প্লাস্টিকের খেলনায় থাকা সিসা শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ ব্যাহত করে এবং শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ক্যাডমিয়াম কিডনি ও হাড়ের ক্ষতি করে, আর থ্যালেটস হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটিয়ে ভবিষ্যতে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শিশুদের খেলনা মুখে দেয়ার অভ্যাস থাকায় এসব রাসায়নিক সহজেই শরীরে প্রবেশের আশঙ্কা থাকে।
যশোরের শিশু চিকিৎসক ডা. আফসার আলী বলেন, তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। ছোট চাকা, বোতাম বা খেলনার ভাঙা অংশ গিলে ফেললে শ্বাসনালিতে আটকে তাৎক্ষণিক শ্বাসরোধের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই খেলনা কেনার সময় দাম নয়, নিরাপত্তা, উপাদান ও বয়স উপযোগিতা বিবেচনা করা জরুরি। ভাঙা বা ক্ষতিগ্রস্ত খেলনা শিশুদের হাতে না দেয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর যশোরের সহকারী পরিচালক সেলিমুজ্জামান বলেন, বাজারে মানহীন ও অনুমোদনহীন খেলনার বিক্রি ঠেকাতে নিয়মিত তদারকি আরও জোরদার করা হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত খেলনা শনাক্ত করে বাজার থেকে অপসারণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও কঠোর করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে শুধু অভিভাবকদের সচেতনতাই যথেষ্ট নয়; বাজারে নিরাপদ খেলনা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

