বাংলার ভোর প্রতিবেদক
ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধ মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক রণজিৎ বাওয়ালি আর নেই। দীর্ঘ চার দশকের জলাবদ্ধ ভবদহ অঞ্চলের মানুষের স্থায়ী মুক্তির দাবিতে রাজপথে সোচ্চার থাকা এই প্রবীণ নেতার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ভবদহ অঞ্চলে।
বুধবার দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে যশোরের অভয়নগর উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামের নিজবাড়িতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। মৃত্যুকালে তিনি অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
রণজিত বাওয়ালির সহকর্মীরা জানান, গত ১ জুলাই সকালে তিনি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হলে প্রথমে অভয়নগর স্বস্থ্য কমপ্লেক্সে পরে ভবদহ পনি নিস্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে তাঁকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৬ দিন চিকিৎসার পর নিউরো মেডিসিন (স্ট্রোক) ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুমন কবীরের তত্তাবধানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে গত ১৫ জুলাই থেকে তিনি নিজ বাড়িতেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। বুধবার হঠাৎ তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পর এদিন দুপুরেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বুধবার সন্ধ্যায় অভয়নগর মহাশ্মশানে তাঁর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ কেন্দ্রীয় কমিটি, যশোর জেলা কমিটি, অভয়নগর উপজেলা কমিটি এবং ভবদহ পানি নিস্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ তাঁর প্রতি ‘রেড স্যালুট’ জানায়। পরে সেখানেই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়
রণজিৎ বাওয়ালি শুধু একজন আন্দোলনের নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভবদহের জলাবদ্ধ মানুষের আস্থার প্রতীক। আশির দশকে ভবদহে জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করার পর থেকেই তিনি মাঠে নেমে মানুষের মধ্যে জনমত গড়ে তোলেন। টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) বাস্তবায়ন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে ছিল তাঁর সক্রিয় নেতৃত্ব। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ভবদহের মানুষের দাবি আদায়ে সক্রিয় ছিলেন।
১৯৮৫ সালে তৎকালীন আহ্বায়ক অমূল্য রতন বিশ্বাসের সঙ্গে ভবদহ আন্দোলনে যুক্ত হন তিনি। ২০০৫ সালে পুনরায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিলে তাঁকে ভবদহ পানি নিস্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের অভয়নগর উপজেলা কমিটির সদস্য ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং ভবদহবাসীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
ছোটবেলা থেকেই বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রণজিৎ বাওয়ালি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি প্রথমে কমরেড নুরুজ্জামান সরদারের সঙ্গে নিজ এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। পরে পার্টির নির্দেশে কমরেড মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে কেশবপুর এলাকায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।
এছাড়া ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর তৎকালীন ফ্যাসিবাদী সরকারের পুলিশ বাহিনীর তাণ্ডবের শিকার হন তিনি। পানিবন্দি মানুষের পানি নিস্কাশনের দাবিতে অভয়নগরে আয়োজিত রাজপথ অবরোধের মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে পুলিশ হামলা চালালে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীকালে চোখের দৃষ্টি হারান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দৃষ্টিহীন ছিলেন, তবুও অদম্য আগ্রহ ও মনোবল নিয়ে পানিবন্দি মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিটি কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন।
রণজিৎ বাওয়ালী রাজনীতির পাশাপাশি ছিলেন একজন চারণ কবি, গীতিকার ও সুরকার। তিনি অসংখ্য গান লিখেছেন। তার দুটি কাব্য প্রকাশিত হয়েছে। যার একটি বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে। চারণ কবি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমিসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন।
এদিকে রণজিত বাওয়ালির মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও ভবদহ পানি নিস্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ, দৈনিক বাংলার ভোরের উপদেষ্টা সম্পাদক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হারুণ অর রশীদ, বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও যশোর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ভবদহ পানি নিস্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা তসলিম-উর-রহমান, সংগ্রাম কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আব্দুল হামিদ, সদস্য সচিব চৈতন্য কুমার পাল, দৈনিক বাংলার ভোর সম্পাদক ও প্রকাশক সৈয়দ আবুল কালাম শামছুদ্দীন জ্যোতি, বাংলাদেশ কৃষক ক্ষেতমজুর সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মিজানুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান ভিটু, বিপ্লবী যুব মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি মাশুক শাহী, সাধারণ সম্পাদক আমিনুল অনল, জেলা কমিটির সভাপতি আহাদ আলী মুন্না, সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল আলম, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি দিলিপ রায়, সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ যুবল, জেলা কমিটির সভাপতি সাইহান বিশ্বাস অর্ক।
সহযোদ্ধারা বলছেন, রণজিৎ বাওয়ালির মৃত্যুতে ভবদহ আন্দোলন তার সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও নিবেদিতপ্রাণ নেতাদের একজনকে হারাল। কিন্তু ভবদহের মানুষের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগ আগামী প্রজন্মের আন্দোলনকর্মীদের পথ দেখাবে।

