হিমেল খান :
বাড়িতে সাপ ঢুকেছে, খবর পেলেই ছুটে যান তিনি। কখনো বসতবাড়ি, কখনো রান্নাঘরে, আবার কখনো খড়ের গাদা কিংবা বাড়ির আঙিনায় ঘাপটি মেরে থাকা সাপ উদ্ধার করেন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে। সাপটি বিষধর না নির্বিষ, তা নিশ্চিত হয়ে প্রশিক্ষিত পদ্ধতিতে উদ্ধার করেন তিনি। এরপর লোকালয় থেকে দূরে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করে দেন। এভাবেই ২০২৩ সাল থেকে যশোরের চৌগাছা ও আশপাশের এলাকায় শতাধিক সাপ উদ্ধার করে প্রকৃতির বুকে ফিরিয়ে দিয়েছেন তরুণ আশিকুল ইসলাম মিথুন।
সাপ দেখলেই আতঙ্কো পিটিয়ে মারার তোড়জোড় করেন এলাকাবাসী। বর্তমানে চৌগাছার সে চিত্র পাল্টে গেছে। বাড়িতে সাপ দেখা দিলে লাঠি হাতে নিধনের বদলে এলাকাবাসী ফোন করছেন মিথুনকে। খবর পেলেই তিনি পৌঁছে যাচ্ছেন ঘটনাস্থলে। নিরাপদে উদ্ধার করছেন সাপ। এতে বাঁচছে সাপ, একই সঙ্গে দুর্ঘটনা কিংবা আতংক থেকেও নিরাপত্তা পাচ্ছেন মানুষ। ছোটবেলা থেকেই বন্যপ্রাণীর প্রতি আগ্রহ ছিল মিথুনের। সাপের প্রতি ছিল বিশেষ আকর্ষণ। সেই আগ্রহ থেকেই বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজের সুযোগ খুঁজে বেড়ান তিনি।
২০২৩ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেস্কিউ টিম ইন বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হন মিথুন। সেখানে সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধারের কৌশল এবং উদ্ধারের পর নিরাপদে অবমুক্ত করার বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। এরপর থেকেই নিজ এলাকা চৌগাছা ও আশপাশের লোকালয়ে সাপের অস্তিত্বের খবর পেলেই ছুটে যান তিনি।
স্থানীয়রা জানান, বাড়ির ভেতর কিংবা আশপাশে সাপ দেখা মাত্র সরাসরি মিথুনকে ফোন করেন এলাকাবাসী। খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এরপর প্রশিক্ষণের রণকৌশল অনুযায়ি নিরাপদ পদ্ধতিতে সাপটি উদ্ধার করেন তিনি। পরে সাপটি প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করেন। মিথুনের এমন মহতি উদ্যোগে বদলেছে স্থানীয়দের জিবনচিত্র। সাপ দেখে আতঙ্ক না ছড়িয়ে, এমনকি পিটিয়ে নিধন না করে মিথুনের স্মরণাপন্ন হচ্ছেন স্থানীয়রা। এতে নিরাপদে জীবনযাপন করছেন এলাকাবাসী, একই সঙ্গে বেঁচে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ সাপ।
চৌগাছা উপজেলার বাসিন্দা সাগর হোসেন বলেন, আগে বাড়িতে সাপ ঢুকলে ভয়ে সেটিকে সকলে মিলে মেরে ফেলতাম। এখন মিথুনকে খবর দেয়া হয়। তিনি এসে সাপ উদ্ধার করেন।
একই উপজেলার আরেক বাসিন্দা মিঠুন বলেন, আগে সাপ দেখলেই আতঙ্ক তৈরি হতো। এখন মিথুনের মতো প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী থাকায় সাপকে না মেরে উদ্ধারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আশিকুল ইসলাম মিথুন বলেন, সাপ দেখলে আতঙ্কিত হয়ে সেটিকে আঘাত করা উচিত নয়। সাপকে উত্ত্যক্ত না করে নিরাপদ দূরত্বে থাকা এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীর সহায়তা নেয়া প্রয়োজন। তার কাছে সাপ হত্যা নয়, নিরাপদে উদ্ধার করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেয়াই লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, সকল বন্যপ্রাণীর বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। তাই বন্যপ্রাণীকে মেরে ফেলা নয়, তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য কাজ করতে হবে। এ লক্ষ্যেই ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড স্নেক রেস্কিউ টিম ইন বাংলাদেশের সাথে কাজ করছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৬ মে সংগঠনটির কার্যক্রম শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকার স্বেচ্ছাসেবীরা যুক্ত হয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়া সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধারে সহযোগিতা করছেন। সংগঠনটির হটলাইনে যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার সহায়তা দেয়া হয়।

সাপ উদ্ধারের প্রয়োজনে কল করুন : আশিকুল ইসলাম মিথুন, মোবাইল : ০১৭৭৮৯৯৬৫৮৫, WSRTBD ( যশোর প্রতিনিধি)
তবে বন্যপ্রাণী উদ্ধারের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। লোকালয়ে ঢুকে পড়া সব সাপ সমান ঝুঁকিপূর্ণ নয়। আবার বিষধর সাপের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ ছাড়া নিজে থেকে ধরতে গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। তাই সাপ দেখলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকারীর সহায়তা নেয়ার পরামর্শ তাদের।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়াউল আমিন বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কৃষির ক্ষেত্রেও সাপ উপকারী। সাপ ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণী খেয়ে ফসল রক্ষায় আগ্রণী ভূমিকা রাখে। প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও সাপের ভূমিকা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃতি থেকে কোনো একটি বন্যপ্রাণীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে এর প্রভাব খাদ্যশৃঙ্খলের অন্য প্রাণীর ওপরও পড়ে। কৃষিপ্রধান এলাকায় ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে সাপের ভূমিকা রয়েছে। ফলে নির্বিচারে সাপ হত্যা না করে লোকালয়ে ঢুকে পড়া সাপকে নিরাপদে উদ্ধার করে প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকেই মিথুনের বন্যপ্রাণী উদ্ধারের পথচলা শুরু হয়েছিল। এখন সেটিই তার নিয়মিত কাজে পরিণত হয়েছে। কোথাও সাপের অস্তিত্বের খবর পেলেই ছুটে যান তিনি। শতাধিক সাপ উদ্ধারের পরও তার লক্ষ্য একটাই সাপ হত্যা নয়, মানুষ ও বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা রক্ষায় সাপকে ফিরিয়ে দেয়া প্রকৃতির মাঝে ।
