বাংলার ভোর প্রতিবরদক :
কচুরিপানার নিচে ড্রাম বেঁধে নদীপথে টেনে নেয়া, কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে রাতের আঁধারে পারাপার, আবার কখনো বৈধ পণ্যবাহী ট্রাকের আড়ালে-এমন নানা অভিনব কৌশলে যশোরের বেনাপোল ও শার্শা সীমান্ত দিয়ে দেশে ঢুকছে মাদক।
সীমান্ত পার হওয়ার পর বিশেষ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ট্রেন, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও বিভিন্ন পরিবহনে করে এসব মাদক পৌঁছে যাচ্ছে যশোরের পাড়া-মহল্লা পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝেমধ্যে চালান ও বাহক আটক হলেও মাদকের মূল কারবারিরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শার্শার কায়বা, রুদ্রপুর, গোগা, অগ্রভুলাট, পাঁচভুলাট, শালকোনা, পাকশিয়া, ডিহি, শিকারপুর ও রামচন্দ্রপুর এবং বেনাপোলের পুটখালী, দৌলতপুর, গাতিপাড়া, সাদীপুর, রঘুনাথপুর, ঘিবা ও ধান্যখোলা সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচারকারীদের তৎপরতা রয়েছে। দুর্গম সীমান্তপথ, নদী ও কাঁটাতারের বিভিন্ন অংশকে কাজে লাগিয়ে মাদক ঢুকছে দেশে ।
স্থানীয়দের দাবি, গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্তে নদীপথে মাদক পারাপারে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করছে পাচারকারীরা। কচুরিপানার আড়ালে ড্রাম বা ভাসমান পাত্র রেখে দড়ির সাহায্যে নদীর এক পাশ থেকে অন্য পাশে টেনে নেয়া হয়। দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় না থাকায় এ কৌশলে নজরদারি এড়িয়ে মাদক পাচার করা হয়।
বেনাপোল পোর্ট থানা এলাকার দৌলতপুর ও সাদীপুর সীমান্তেও রাতের আঁধারে কাঁটাতারের ফাঁক ব্যবহার করে মাদক আনার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, সুযোগ বুঝে এসব পথ ব্যবহার করে সীমান্ত পার করা হয় বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য।
বন্দরের বাণিজ্যপথ নিয়েও প্রশ্ন
চোরাই সীমান্তপথের পাশাপাশি বৈধ বাণিজ্যের আঁড়ালেও মাদক দেশের অভ্যন্তরে ঢোকার অভিযোগ রয়েছে। বন্দরসংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র ও স্থানীয়দের দাবি, ভারতীয় পণ্যবাহী ট্রাকের সঙ্গে মাদক আনার চেষ্টা করে চক্রটি। সীমান্ত অতিক্রমের পর সুবিধামতো পরিবহন বদলে তা দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে পাচারকারীরা প্রতিনিয়ত কৌশল পরিবর্তন করছে। শুকনো মরিচ, জুতা, মাছ, কচ্ছপ কিংবা পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে মাদক পরিবহনের ঘটনাও বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে।
সীমান্ত দিয়ে মাদক ঢোকার পর এর বড় একটি অংশ যশোর ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। পুটখালী ও দৌলতপুর এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যশোরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তরুণ ও কলেজপড়ুয়া তরুণেরা মাদক সংগ্রহ বা সেবনের জন্য এসব এলাকায় আসছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সীমান্ত থেকে মাদক যশোরে আসার পর তা আটকে থাকছে না। একটি বিস্তৃত সরবরাহ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে যাচ্ছে। বাস-ট্রেন, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিভিন্ন যানবাহনে করে মাদক পরিবহনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
যশোরে পাড়া-মহল্লায়ও মাদকের ছড়াছড়ি
সীমান্তের পাশাপাশি যশোর শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ঘোপ, বারান্দিপাড়া, মোল্লাপাড়া, বেজপাড়া, বকচর, শংকরপুর, আরএন রোড, খালধার রোড, কারবালা, খড়কি, পালবাড়ি ও কাজীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। শহরতলীর ফতেপুর, চাঁচড়া, শেখহাটি, বিরামপুর ও উপশহর এলাকাতেও একই অভিযোগ রয়েছে।
মাদক বিক্রির সঙ্গে রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মাদক কারবার চলছে। তবে এসব অভিযোগের বিস্তারিত যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিদর্শক ব্রজেন্দ্র নাথ গাইন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অভিযানের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পাড়া-মহল্লায় লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাদককারবারিদের আটক করে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দেয়া হচ্ছে।
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মিরাজুল ইসলাম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মাদকের বিষয়ে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। প্রতিটি থানা, ফাঁড়ি ও ক্যাম্পকে মাদকের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় না দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, চোরাচালানের মূল হোতারা নিজেরা মাদক বহন করেন না। এ কারণে তাদের হাতেনাতে আটক করা সম্ভব হয় না। তবে কোনো কোনো সময় বহনকারীদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে মূল হোতাদের আটক করা হয়। সীমান্ত দিয়ে মাদক যাতে ঢুকতে না পারে, সে জন্য বিজিবি সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।
