বাঘারপাড়া সংবাদদাতা :
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে সেবা নিতে গিয়ে শিক্ষকদের হয়রানি ও অর্থ দাবির অভিযোগ উঠেছে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ফাইল নানা অজুহাতে আটকে রেখে পরে অর্থের বিনিময়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়, এমন অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষক ও ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৪ সালের ৩ জুন অভয়নগর উপজেলা থেকে সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে বদলি হয়ে বাঘারপাড়ায় যোগদানের পর থেকেই অফিসের কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। টাকা ছাড়া ফাইল ছাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
বাঘারপাড়া উপজেলায় ৪৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ৩২টি মাদ্রাসা ও ১৩টি কলেজসহ মোট ৯৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে নিয়মিত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে যেতে হয়।
শিক্ষকদের অভিযোগ, টাইম স্কেল, বিএড স্কেল, নতুন এমপিওভুক্তি, বকেয়া ও এরিয়ার বিলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ে অফিসে গেলে ফাইলের ধরন অনুযায়ী এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মোবাইল ফোনে ডেকে এনে অর্থ চাওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক বলেন, কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকার পরও অর্থ না দিলে নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। পরে টাকা দিলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা হয়। অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইল বাতিল বা ফেরত পাঠানোর ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
একজন শিক্ষক বলেন, “ফাইল ঠিক থাকার পরও টাকা না দিলে নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। টাকা দিলে আবার দ্রুত কাজ হয়ে যায়। টাকা দিতে না চাইলে ফাইল বাতিল বা ফেরত পাঠানোর ভয় দেখানো হয়।”
আরেক শিক্ষক বলেন, বিভিন্ন কাজ নিয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে গেলে অর্থ দিতে হয়-এমন একটি ধারণা শিক্ষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে টাইম স্কেল, বিএড স্কেল, নতুন এমপিও, বকেয়া ও এরিয়ার বিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিয়ে তারা চাপের মধ্যে থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের সরাসরি অফিসে ডেকে নেয়া হয়। সেখানে ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির বিনিময়ে অর্থ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
তবে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বাঘারপাড়া পৌরসভার একটি মাদ্রাসাকে ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০ বছর ধরে কার্যত বন্ধ। সেখানে নিয়মিত পাঠদান হয় না এবং বর্তমানে শিক্ষার্থীও নেই। অথচ সম্প্রতি ওই মাদ্রাসার পক্ষে প্রতিষ্ঠানটি চালু রয়েছে এবং সেখানে শিক্ষার্থী রয়েছে, এমন মর্মে প্রত্যয়ন দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই প্রত্যয়নকে কেন্দ্র করে বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, এ ঘটনায় লাখ টাকার আর্থিক সুবিধা নেয়া হয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের একটি বন্ধ প্রতিষ্ঠানকে কাগজে-কলমে সক্রিয় দেখিয়ে প্রত্যয়ন দেয়া হয়ে থাকলে তা শুধু আর্থিক অনিয়মের প্রশ্ন নয়, শিক্ষা প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও গুরুতর বিষয়। তাই বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
শুধু ফাইল নিষ্পত্তির বিনিময়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ নয়, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের বিভিন্ন কেনাকাটা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, অফিসের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ আসার পর নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সামগ্রি কেনা হয় না। বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আশিকুজ্জামানের নিয়মিত ও নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজ নিয়ে শিক্ষকরা অফিসে এসে অনেক সময় কর্মকর্তাকে না পেয়ে ফিরে যান। এর আগেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আশিকুজ্জামানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
শিক্ষকদের হয়রানি, ফাইল আটকে অর্থ দাবি, বন্ধ মাদ্রাসাকে সক্রিয় দেখিয়ে প্রত্যয়ন এবং অফিসের কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগগুলো অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শিক্ষা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তাই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
