বাংলার ভোর প্রতিবেদক
অল্প বৃষ্টিতেই জমে পানি। তলিয়ে যায় সবজির বীজতলা। জমে থাকা পানি আর রোদের তাপে পচে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার চারা। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে লোকসানের মুখে পড়ছেন কৃষকেরা। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় যশোর সদর উপজেলার আবদুলপুরে সাড়ে ৭ হেক্টর জমির সবজির বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকার চারা নষ্ট হয়েছে। অথচ এই আবদুলপুরের চারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। বীজ ও চারার বাণিজ্য ঘিরে এখানে বছরে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে এবার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পলি হাউস নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি কালভার্ট নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। গত ১ অক্টোবর শুরু হওয়া এ কাজ আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার নির্ধারিত সময় রয়েছে। কৃষকদের দাবি, কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে।
সবজির চারা উৎপাদন খ্যাত যশোর সদর উপজেলার আবদুলপুর। এখানকার কৃষকেরা বাণিজ্যিকভাবে বিভিন্ন ধরনের সবজির চারা উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করেন। কৃষিকাজের পাশাপাশি চারার এই ব্যবসা অনেক পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে। স্থানীয় কৃষকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, আবদুলপুরের ৫৭ বিঘা জমিতে ৬৪ জন কৃষক সবজির চারা উৎপাদন করেন। প্রতি বিঘায় তৈরি করা হয় প্রায় ১২০টি বেড। প্রতিটি বেডে উৎপাদিত হয় প্রায় চার হাজার চারা। জমির প্রতিটি অংশ কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয় এসব বীজতলা। বীজ সংগ্রহ, বেড তৈরি, চারা পরিচর্যা ও বিক্রির কাজে ব্যস্ত সময় পার করেন কৃষকেরা।
স্থানীয় কৃষকের দেয়া হিসাব অনুযায়ী মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ছয় মাসে তিন দফায় শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করেন কৃষকরা। তাদের হিসাবে, এ সময়ে বীজ ও চারার কেনাবেচা হয় অন্তত ১০ কোটি টাকার। প্রতিদিন এখান থেকে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার চারা সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। মাসে এই বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় দুই থেকে তিন কোটি টাকা। ফলে আবদুলপুরের বীজতলা শুধু স্থানীয় কৃষকদের আয়ের উৎস নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকার সবজি উৎপাদনের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
কিন্তু বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এই সম্ভাবনাময় চারা উৎপাদনকেন্দ্র এখন জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে রয়েছে। অল্প বৃষ্টিতেই নিচু জমিগুলোতে পানি জমে যায়। পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে তা বীজতলায় আটকে থাকে। এতে চারার গোড়ায় পচন ধরে। জমে থাকা পানি ও রোদের উত্তাপে অনেক চারা নষ্ট হয়ে যায়। বিক্রির উপযোগিতা হারানো এসব চারা আর বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।
আব্দুলপুর গ্রামের কৃষক বাশার আলী বলেন, চারা উৎপাদনের জন্য আগেই বীজ, সার, ওষুধ ও অন্যান্য উপকরণ কিনতে হয় তাদের। এছাড়া বেড তৈরি, শ্রমিকের মজুরি এবং নিয়মিত পরিচর্যাতেও ব্যয় রয়েছে। উৎপাদিত চারা বিক্রি করে সেই খরচ তুলে লাভের আশা করেন কৃষকেরা। তার দাবি, জলাবদ্ধতায় চারা নষ্ট হলে পুরো বিনিয়োগই ঝুঁকির মুখে পড়ে। একদিকে নষ্ট হয় চারার, অন্যদিকে নতুন করে উৎপাদন শুরু করতে গুনতে হয় বাড়তি খরচ।
স্থানীয় আরেক কৃষক আমিন উদ্দিন বলেন, এবারের বর্ষা মৌসুমে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় সাড়ে ৭ হেক্টর জমির বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকার চারা নষ্ট হয়েছে এখানকার কৃষকদের। ক্ষতিগ্রস্ত চারা বাঁচাতে তারা বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক ও ওষুধ প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু জমিতে পানি জমে থাকায় তাতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাদের মতে, পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকলে শুধু ওষুধ প্রয়োগ করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
আবদুলপুর থেকে চারা কিনতে আসেন দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এখানকার চারা সংগ্রহ করে তারা নিজেদের এলাকায় সবজি উৎপাদন করেন। পটুয়াখালি থেকে চারা কিনতে আসা এক ব্যবসায়ী জুলফিকার আলী বলেন, এখানকার চারার মান ভালো। কিন্তু সময়মতো চারা সরবরাহ করতে না পারলে বিকল্প উৎস থেকে চারা সংগ্রহ করতে হয় তাদের। এতে পরিবহন খরচ ও উৎপাদন ব্যয় দুটোই বেড়ে যায়।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতার সমস্যা দীর্ঘদিনের। সামান্য বৃষ্টিতেই বীজতলায় পানি জমে যাওয়ায় তাদের নিয়মিত উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এ সমস্যা সমাধানে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। কৃষি কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করলেও দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় ছিলেন তারা। তাদের মতে, শুধু ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলা পরিদর্শন কিংবা পরামর্শ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। পানি দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। তা না হলে একই ধরনের ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে এবার অবকাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএডিসির পলি হাউস নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় আবদুলপুরে ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি কালভার্ট নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। বিএডিসি যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মাযহারুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন। ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এ কাজের শেষ করার নির্ধারিত তারিখ আগামী ১৫ নভেম্বর। কালভার্টটি নির্মিত হলে এলাকার পানি নিষ্কাশনে সুবিধা হবে বলে আশা করছেন তিনি।
কালভার্ট নির্মাণের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর পানি নিষ্কাশনের ক্ষেত্রে এটি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে রয়েছে অপেক্ষা। কৃষকদের প্রত্যাশা, কালভার্ট নির্মাণের পাশাপাশি পানি চলাচলের পথ সচল রাখার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হবে। যাতে সামান্য বৃষ্টিতে আবারও জমিতে পানি আটকে না থাকে এবং বীজতলা রক্ষায় বারবার লোকসানের মুখে পড়তে না হয়।
যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ রয়েছে। কৃষি বিভাগ ও বিএডিসির সমন্বিত উদ্যোগে সমস্যাটির সমাধানের কাজ চলছে। তবে তাদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা এবং স্বাভাবিকভাবে চারা উৎপাদন চালু রাখা।
