কাজী নূর
ভরা মৌসুমে যশোরের বাজারে ইলিশের সরবরাহ কয়েক গুণ বাড়লেও সাধারণ মানুষের নাগালে আসেনি দাম। বরং ইলিশের স্বাদ নিতে বাজারে এসে দাম শুনেই ফিরে যাচ্ছেন অনেক ক্রেতা। এ অবস্থায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ভরা মৌসুমেও ইলিশ যেন বিলাসী খাবারে পরিণত হয়েছে।
এদিকে ইলিশের বাইরে যশোরের বাজারে অন্যান্য মাছের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে। সবজির সরবরাহ বাড়ায় কয়েকটি সবজির দামও কমতির দিকে। মুরগি ও ডিমের বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা নেই। তবে পোলাও চাল, আটা, ময়দা ও চিনিসহ কয়েকটি মুদি পণ্যের দাম নিয়ে ব্যবসায়ীরা শঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
শুক্রবার সকালে যশোর শহরের হাজী মোহাম্মদ মহসিন রোড বড়বাজারে সরেজমিন ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
ইলিশের সরবরাহ বাড়ায় আড়ত ও বাজারে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থান থেকেও ক্রেতারা আসছেন। ফলে আড়তগুলোতে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের হাঁকডাকে মুখর পরিবেশ দেখা গেলেও কাক্সিক্ষত বিক্রি হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
ইলিশ বিক্রেতা এরশাদ আলী বলেন, গত দুই সপ্তাহের তুলনায় বাজারে ইলিশের সরবরাহ কয়েক গুণ বেড়েছে। দামও কিছুটা কমেছে। কিন্তু বেচাকেনা তেমন বাড়েনি। অধিকাংশ ক্রেতাই মাছ হাতে নিয়ে দেখে এবং দাম শুনে ফিরে যাচ্ছেন।
বর্তমানে ৬০০ গ্রাম আকারের ইলিশ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা, ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রামের ইলিশ ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, ৯০০ গ্রামের ইলিশ ২ হাজার ৬০০ টাকা এবং ১ কেজি বা তার কিছু বেশি ওজনের ইলিশ প্রায় ৩ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রামের ইলিশও বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার টাকা কেজি দরে।
সদর উপজেলার নওয়াপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ফতেহ মোহাম্মদ কিরণ বলেন, গত দুই সপ্তাহের তুলনায় ইলিশের দাম কিছুটা কমেছে। মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে স্বাদ নেয়ার জন্য তিনি ১ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের একটি ইলিশ ৩ হাজার টাকা কেজি দরে কিনেছেন।
তবে তার মতো ক্রেতা খুব বেশি নন। অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতা ইলিশের দাম শুনে কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাচ্ছেন।
পৌর শহরের খড়কি পীরবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ভরা মৌসুমে ইলিশের এমন চড়া দাম আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য হতাশার। ইলিশ কিনলে সংসারের অন্য খরচ কমাতে হয়। তাই সাধ্যের বাইরে গেলে না খেয়েই থাকতে হয়।’
লোন অফিসপাড়ার বাসিন্দা সৈয়দ এনামুল হক বাবু বলেন, ‘ভরা মৌসুমে যদি ইলিশের দাম এত বেশি হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ কীভাবে কিনবে? বড় মাছের পাশাপাশি ছোট আকারের ইলিশ পিস হিসেবে বিক্রি করলে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কিনতে পারবে।’
অভিজাত একটি বিপণী বিতানের নিরাপত্তাকর্মী সদরের কাশিমপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহিদুল কবির নান্টু বলেন, ইলিশের দাম শুনেই তিনি চলে গেছেন। সাধ্যের মধ্যে থাকলে কিনতেন। তার ইচ্ছা ছিল পরিবারের সবাই মিলে ইলিশ মাছ খাবেন!
ক্রেতাদের অভিযোগ, ভরা মৌসুমে সরবরাহ বাড়ার পরও ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকায় মৌসুমের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে আড়াই কেজি সাইজের রুই কেজি প্রতি ৩৫০ থেকে ৩৭০ টাকা, ৫ কেজি সাইজের কাতলা ৫২০ টাকা, আড়াই কেজি সাইজের কাতলা ৩৮০ টাকা, পারশে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, শিং ৪০০ টাকা বেলে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, পুঁটি ২৫০ টাকা, বাগদা চিংড়ি ৮০০ টাকা, চাপলে ৪০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, হরিণা চিংড়ি ৮৮০ থেকে ৯০০ টাকা, চাকা চিংড়ি ৮৫০ টাকা, কৈ ১৮০ থেকে ৩০০ টাকা, টাকি ৫২০ টাকা, নাইলোটিকা ২০০ থেকে ২২০ টাকা, টেংরা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, পাঙাশ ১৮০ থেকে ৩৩০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
মাছ বিক্রেতা পবিত্র সাহা বলেন, মাছের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। বেচাকেনাও ভালো।
হাজী মোহাম্মদ মহসিন রোড জামে মসজিদ লেনের বাসিন্দা সেলিম রেজা বলেন, শুক্রবারের বাজার একটু বেশি থাকে। এদিনেই আমাদের বাজার করতে হয়।
সবজির বাজার কালীবাড়ি রোড ও নিচের বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে মানভেদে বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা, কাকরোল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, করলা ৪০ টাকা, পটল ৩০ থেকে ৪০ টাকা, কচুর মুখি ৩০ থেকে ৪০ টাকা, কচুরলতি ৬০ টাকা, ঢেড়স ৪০ টাকা, আমড়া ৩০ টাকা, ওল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ধুন্দল ৩০ থেকে ৪০ টাকা, পেঁপে ২০ টাকা, উচ্ছে ৬০ টাকা, টমেটো ১০০ টাকা, কাঁচামরিচ ৬০ থেকে ৮০ টাকা, পুঁইশাক ৩০ টাকা, মিষ্টি কুমড়ো ৪০ থেকে ৬০ টাকা, কাঁচকলা ৩০ থেকে ৪০ টাকা, সবুজ শাক ৪০ টাকা, লাল শাক ৩০ টাকা, ডাটা ৪০ টাকা, ঝিঙে ৪০ থেকে ৬০ টাকা, কুশি ৪০ থেকে ৬০ টাকা, বরবটি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, শসা ৬০ টাকা, লাউ ও চাল কুমড়ো ৩০ থেকে ৪০ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি হয়েছে।
এছাড়া আগাম শীতকালীন সবজি ফুলকপি কেজি প্রতি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা, শিম ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, মূলা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, পালং শাক ৮০ টাকা ও মিচুড়ি ১২০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
কালীবাড়ি রোডের সবজি বিক্রেতা আতিয়ার রহমান বলেন, সবজির দাম কমতির দিকে। আবহাওয়া ঠিক থাকলে আর কোন আশংকা নেই।
নিচের বাজারের সবজি বিক্রেতা জয়দেব সাহা বলেন, বেচাকেনা ভালো। দাম নাগালের মধ্যে থাকলে ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ের জন্য লাভ।
শহরের ঘোপ জেল রোডের বাসিন্দা শেখ আবিদ আব্দুল্লাহ বলেন, সবজির দাম ঠিক আছে। কিন্তু মাছের দাম ঠিক নেই। মাছ নিয়ে লেখালেখি করেন।
মুরগির বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা, সোনালি ২৬০ থেকে ৩০০ টাকা ও লেয়ার ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
মামা ভাগ্নে ব্রয়লার হাউজের স্বত্বাধিকারী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মুরগির দাম স্থিতিশীল রয়েছে। বেচাকেনা ভালো।
এছাড়া গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা ও খাসীর মাংস ১২০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
মুদিপণ্যের বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল কেজি প্রতি ২০৪ থেকে ২১০ টাকা, সরিষার তেল ২২০ থেকে ২৩০ টাকা, পাম তেল থেকে ১৮৪ থেকে ১৮৬ টাকা, সুপার তেল ১৯০ টাকা, পোলাও চাল ১৭০ থেকে ২৫০ টাকা, আটা ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা, ময়দা ৬২ থেকে ৭০ টাকা, মুগ ডাল ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, মসুরির ডাল ১০০ থেকে ১৬০ টাকা, ছোলার ডাল ৯০ থেকে ১০০ টাকা, বুটের ডাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, সাদা চিনি ১১০ থেকে ১১২ টাকা, লাল চিনি ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা, আলু ২৫ টাকা, পেঁয়াজ ৫০ টাকা, রসুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা ও আদা ১৬০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
মুদিপণ্য ব্যবসায়ী আজিম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শেখ আব্দুল আজিম বলেন, বাজার স্থিতিশীল থাকলেও কিছুটা শংকা রয়েছে। যেমন পোলাও চাল, আটা, ময়দা, চিনির দাম ঘোষণা ছাড়াই বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু প্যাকেটজাত কোম্পানি তাদের পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে বলে আগাম জানিয়েছে।
চালের বাজার চাল চান্নী ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে, বাসমতি ৭৫ থেকে ৮০ টাকা, আটাশ ৫২ থেকে ৫৫ টাকা, সুবর্ণলতা ৫৫ টাকা, নূরজাহান ৫০ টাকা, পাইজাম ৪৯ টাকা, নাজিরশাইল ৯৫ টাকা, বিল আমন ৬০ টাকা, মিনিকেট ৫৫ থেকে ৬০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
চাল বিক্রেতা অসিত স্টোরের স্বত্বাধিকারী অসিত সাহা বলেন, আপাতত চালের বাজার অস্থিতিশীল হবার কারণ নেই। চালের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে।
ডিমের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে লাল ডিম হালি প্রতি ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা, সাদা ডিম ৪২ থেকে ৪৪ টাকা, হাঁসের ডিম ৬৮ টাকা, দেশি মুরগি ডিম ৭২ টাকা ও কোয়েল পাখির ডিম ১২ টাকা বিক্রি হয়েছে।
ডিম বিক্রেতা নবারুণ সাহা বলেন, ডিমের দাম কিছুটা কমেছে। আরো কিছুটা কমতে পারে।
সব মিলিয়ে যশোরের বাজারে সরবরাহ বাড়লেও ইলিশের চড়া দামই এখন ক্রেতাদের প্রধান হতাশার কারণ। ভরা মৌসুমে ইলিশের সরবরাহের সুফল সাধারণ মানুষের প্লেটে পৌঁছাবে কি না-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

