বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চার জেলার ২৯টি বাঁওড়ের মৎস্যসম্পদ উন্নয়নে ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে বাঁওড়ের মাছের উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যশোরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকার মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জেলেদের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘নির্বাচিত বাঁওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার নির্বাচিত বাঁওড়গুলোতে খনন, মাছের অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, পোনা উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও মৎস্যজীবীদের প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির ব্যয় ও কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ফলে এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি প্রকল্পটি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যশোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে এ অঞ্চলের বাঁওড়গুলোতে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রকল্প গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, মৎস্য বিভাগের প্রতিনিধি ও স্থানীয় ব্যক্তিরা অংশ নেন।
সভায় প্রকল্প গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৎকালীন সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। পরে জনবল কাঠামোর অনুমোদনের জন্য অর্থ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়। বর্তমান সরকারের সময়ে জনবল কাঠামোর অনুমোদন পাওয়ার পর ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, দীর্ঘদিন পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া বাঁওড়ের নির্বাচিত অংশ খনন করে গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো হবে। এ খাতে ১১ কোটি ২১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। এতে শুষ্ক মৌসুমেও মাছের বসবাস ও বেড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে ২৯টি বাঁওড়ে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠায় ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এ ছাড়া বিদ্যমান ৩৫টি পোনা উৎপাদন পুকুর সংস্কারে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৩৯ হাজার, খামার যান্ত্রিকীকরণে ১ কোটি ৪০ লাখ এবং পানি সরবরাহের জন্য ছয়টি গভীর নলকূপ স্থাপনে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাঁওড় ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদার করতে জরাজীর্ণ ছয়টি ব্যবস্থাপকের কার্যালয় পুননির্মাণে ৭ কোটি ৩১ লাখ ৮ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি পাঁচ বছরে ২৯০টি বিল নার্সারি স্থাপনে ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং রুইজাতীয় ও দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্তকরণে ৭ কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। পোনা উৎপাদন ও লালন-পালন বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ধারিত জলাশয়ে পোনা অবমুক্ত করে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। প্রকল্পের সরঞ্জাম কেনার জন্যও আট লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য বাঁওড়ের প্রকৃত মৎস্যজীবীদের চিহ্নিত করে তাদের অংশগ্রহণে টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাঁওড়ের অনেক মৎস্যজীবী সমিতির সদস্য তালিকা হালনাগাদ হয়নি। ফলে প্রকৃত জেলেদের অন্তর্ভুক্তি, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাছ আহরণের সুফল সুষমভাবে বণ্টনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, বাঁওড়গুলোতে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই এ প্রকল্পের লক্ষ্য। নির্বাচিত জলাশয়ে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, মাছের নিরাপত্তায় নজরদারি এবং স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, অভয়াশ্রমের নির্ধারিত এলাকায় মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রিত থাকবে, যাতে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। বর্ষা মৌসুমে মাছ আশপাশের নদী ও বিলে ছড়িয়ে পড়লে সেখান থেকে স্থানীয় জেলেরা মাছ আহরণ করতে পারবেন। এতে মাছের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের জীবিকায় দীর্ঘমেয়াদি সুফল আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রকল্পের ব্যয় ও কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা বর্তমানে মূল্যায়নাধীন। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় পর্যালোচনার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. খালেদ কনক জানিয়েছেন, এটি একটি সমাজভিত্তিক মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্প। দীর্ঘদিন ধরে বাঁওড়ের জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে এ ধরনের প্রকল্পের ঘাটতি রয়েছে। অনেক বাঁওড় অগভীর হয়ে যাওয়ায় মাছের বসবাস ও উৎপাদনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে জলাশয়ের উন্নয়ন এবং সমাজভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাঁওড়ের প্রকৃত মৎস্যজীবীদের তালিকা হালনাগাদ করাও প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। নব্বইয়ের দশকে গঠিত মৎস্যজীবী সমিতিগুলোর সদস্য তালিকা দীর্ঘদিন ধরে হালনাগাদ হয়নি। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অন্তর্ভুক্তি, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং মাছ আহরণের সুফল সুষমভাবে বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রস্তাবিত ব্যয়ের যৌক্তিকতা, অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা, সরঞ্জামের দর ও স্পেসিফিকেশন এবং জনবল কাঠামো মূল্যায়নের বিষয় রয়েছে।
