হিমেল খান
শীত আসার আগেই আগাম জাতের শিম চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন যশোরের কৃষকেরা। জমিতে শিমগাছের পরিচর্যা, আগাছা পরিষ্কার ও মাচা ঠিক করার পাশাপাশি অপেক্ষা করছেন ফলনের। গাছে আসতে শুরু করায় এবার আগেভাগে শিম তুলে ভালো দাম পাওয়ার আশাও করছেন তারা।
তবে কৃষকের সেই আশায় এখন শঙ্কার মেঘ। বিরূপ আবহাওয়া ও অতিরিক্ত তাপমাত্রায় গাছে সদ্য ফোটা ফুল পচে ঝড়ে পড়ছে। এতে শিমের গুটি কম ধরার পাশাপাশি ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, আগাম শিম চাষে বীজ, সার, কীটনাশক ও পরিচর্যায় যে অর্থ ব্যয় করেছেন, উৎপাদন কমে গেলে সেই খরচ তুলে লাভ করা কঠিন হবে। অন্যদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, আবহাওয়ার কারণে আগাম শিমের উৎপাদন কিছুটা কমলেও বাজারে সরবরাহে সংকট তৈরি হবে না বলে আশা করছেন বিভাগটি।
যশোর সদর উপজেলার হৈবতপুর ইউনিয়নের মাঠজুড়ে এখন আগাম জাতের শিমের আবাদ। শীতকালীন এই সবজি ঘিরে কৃষকদের ব্যস্ততা বেড়েছে। কেউ জমিতে শিমগাছের পরিচর্যা করছেন, কেউ আবার গাছের আগাছা পরিষ্কার করছেন। মৌসুমের শুরুতে বাজারে শিম তুলতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যায়। সেই আশাতেই অনেক কৃষক আগাম জাতের শিম চাষ করেন। কিন্তু এবার ফুল আসার পরই পচন ধরে ঝরে পড়তে থাকায় এখন প্রত্যাশিত ফলন পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
কৃষকেরা জানান, শিম চাষের শুরু থেকেই জমি প্রস্তুত, বীজ বপন, সার প্রয়োগ, সেচ, মাচা তৈরি ও গাছের পরিচর্যায় অর্থ ব্যয় করতে হয়। গাছে ফুল আসার পর ফলনের সম্ভাবনা বোঝা যায়। এ সময় গাছে পর্যাপ্ত ফুল টিকে থাকলে শিমের গুটি আসে এবং ফলন বাড়ে। কিন্তু এবার অনেক গাছে সদ্য ফোটা ফুল পচে ঝরে যাচ্ছে। এতে গাছে শিমের গুটি কম ধরার আশঙ্কা করছেন তারা। ফুল ঝরে পড়ার এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কমে যেতে পারে। এতে মৌসুমের শুরুতে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও উৎপাদন খরচ পুষিয়ে নেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
আগাম শিম চাষের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মৌসুমের শুরুতে বাজারে সবজি সরবরাহ করে ভালো দাম পাওয়া। সাধারণত বাজারে নতুন শিম আসার সময় সরবরাহ তুলোনামূলোক কম থাকে। ফলে এ সময় শিম কিক্রি করে কৃষকেরা বাড়তি আয় কতে পারেন। এ কারণে অনেক কৃষক আগাম আবাদ করে থাকেন। তবে ফলন কমে গেলে বাজারে ভালো দাম পেলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ নাও হতে পারে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ফলন কমে গেলে লোকসানের মুখে পড়তে হবে বলে আশঙ্কা তাদের। কৃষকদের মতে, চাষাবাদের খরচ দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে ফলন কমে গেলে লাভের পরিমাণ আরও কমে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে আগাম শিমের আবাদ করে বাড়তি আয়ের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
হৈবতপুর এলাকার কৃষক আনিছুর রহমান জানান, এ বছর বিরূপ আবহাওয়ার কারণে গাছে সদ্য ফোটা ফুল পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শিমের ফলন অনেকটাই নির্ভর করে গাছে কতটা ফুল টিকে থাকছে, তার ওপর। ফুল থেকে গুটি তৈরি হলে তবেই ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ফুল ঝরে পড়ায় সেই সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এখন গাছে যত বেশি ফুল টিকে থাকবে, ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে। তাই ক্ষতি কমিয়ে উৎপাদন ধরে রাখার আশায় তাঁরা নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করছেন।
একই এলাকার কৃষক আবুল কাশেম জানান, এ বছর তিনি যে পরিমাণ ফলনের আশা করেছিলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে তা অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। গাছে ফুল আসার পর থেকেই পচন ধরে ঝরে পড়ছে। এতে শিমের গুটি কম ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চাষাবাদে ইতোমধ্যে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, ফলন কমে গেলে তা তুলে আনা কঠিন হবে। তিনি বলেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলন না হলে খরচ তোলাই দায় হয়ে পড়বে। এখন উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, আগাম জাতের শিম চাষের জন্য সাধারণত বৈশাখ মাসে বীজ বপন করা হয়। পরে গাছের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাচা তৈরি করে দেওয়া হয়। এরপর গাছে ফুল আসে এবং শিম ধরতে শুরু করে। মৌসুমের শুরুতে বাজারে নতুন শিমের চাহিদা ও দাম ভালো থাকায় এ সময় বিক্রি করে লাভের সুযোগ থাকে। কিন্তু এ বছর বিরূপ আবহাওয়ায় মাঠের অধিকাংশ গাছের ফুল পচে নষ্ট হয়েছে বলে দাবি তার। এতে ফলন আশানুরূপ হবে না বলে মনে করছেন তিনি। রফিকুল ইসলাম বলেন, ফলন কম হলে বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও পরিচর্যার খরচ বাদ দিয়ে লাভ খুব সামান্য থাকবে। বাড়তি আয়ের আশায় আগাম শিম চাষ করলেও এবার সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তিনি।
যশোরের কৃষি অর্থনীতিতে সবজি চাষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় সারা বছর নানা ধরনের সবজি উৎপাদিত হয়। এসব সবজি স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারেও সরবরাহ করা হয়। সবজি চাষের মাধ্যমে বহু কৃষক তাদের জীবিকা নির্বাহ করেন। বিশেষ করে আগাম সবজি চাষ কৃষকদের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করে। মৌসুমের শুরুতে বাজারে পণ্য সরবরাহ করতে পারলে তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যায়। সে কারণে শিমসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজির আগাম আবাদে কৃষকদের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব পড়লে তাঁদের সেই বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে। এবার আগাম শিমের ফুল পচে ঝরে পড়ায় কৃষকদের মধ্যে ফলন ও লাভ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, বিরূপ আবহাওয়ার কারণে আগাম শিমের উৎপাদন কিছুটা কমতে পারে। তবে এর প্রভাব সামগ্রিক বাজারে বড় আকারে পড়বে না বলে মনে করছে তারা। আগাম শিমের সরবরাহ কমলেও অন্যান্য এলাকায় উৎপাদিত শিম এবং পরবর্তী সময়ে বাজারে আসা শিমের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
একই সঙ্গে গাছের পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও ফলন ধরে রাখার বিষয়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোসা. রাজিয়া সুলতানা বলেন, আবহাওয়ার কারণে আগাম শিমের কিছু ক্ষতি হতে পারে। মূলত বাজারে সবজির সরবরাহ ধরে রাখতেই আগাম চাষ করা হয়। এ সময়ে আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবের কারণে ফলন কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে বাজারে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে যশোর সদর উপজেলায় আগাম শীতকালীন শিমের আবাদ হয়েছে ১১৭ হেক্টর জমিতে। এসব জমিতে উৎপাদিত শিম মৌসুমের শুরুতে বাজারে আসার কথা। তবে ফুল পচে ঝরে পড়ার কারণে শেষ পর্যন্ত ফলন কতটা কমবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন কৃষকেরা। এখন আবহাওয়া অনুকূলে এলে গাছে নতুন ফুল ও গুটির পরিমাণ বাড়বে বলে আশা করছেন তারা। এতে উৎপাদন খরচ পুষিয়ে লাভের মুখ দেখার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে আবহাওয়ার বিরূপ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগাম শিম চাষে তাদের প্রত্যাশিত আয় ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
