কাজী নূর :
শ্রেণীভেদে জীবনের চাহিদা ও বাজারের চিত্র কতটা ভিন্ন হতে পারে, তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে যশোরের মাছের বাজারগুলোতে। সাগরাঞ্চলে প্রচুর ইলিশ শিকারের খবর মিললেও, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে এই রূপালী মাছ এখন নিছকই এক অধরা স্বপ্ন। অতিরিক্ত দামের কারণে প্রতিদিন বাজারে এসে হতাশ হয়ে খালি হাতে ফিরছেন শত শত খেটে খাওয়া মানুষ।
যশোর শহরের বড় বাজারে শুক্রবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতি কেজি সাইজের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২,৮০০ থেকে ৩,২০০ টাকায়। ১ কেজি ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ঠেকেছে ৩,৫০০ টাকায়। এমনকি ৭০০-৮০০ গ্রামের ইলিশ ২,০০০ টাকা এবং ৪০০-৫০০ গ্রামের ইলিশ ১,৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারের এই দরদাম সাধারণ শ্রমজীবীদের দৈনন্দিন উপার্জনের সামর্থ্যকে বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে। যশোর শহরের ইজিবাইক চালক আকাশ মোল্লা জানান, দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় বাবাকে হারানোর পর পরিবারের দায়িত্ব এখন তার কাঁধে। ছোট দুই ভাই-বোন ও মাকে নিয়ে তার সংসার। “গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করলেই মালিককে ৬০০ টাকা জমা দিতে হয়। প্রতিকূল দিনে আয় না হলেও এই জমা মাফ নেই। প্রতিদিন অল্প অল্প করে ৬০০ টাকা জমা করে যেখানে সংসার চালানোই কঠিন, সেখানে হাজার টাকায় ইলিশ কেনা আমাদের জন্য আকাশকুসুম কল্পনা,” বলছিলেন আকাশ।
একই চিত্র ধরা পড়ে সাতক্ষীরা থেকে এসে যশোরে রিকশা চালানো শেখ আকবর বাহাদুরের কথায়। রিকশার দৈনিক জমা ৩০০ টাকা দেয়ার পর তার পকেটে থাকে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। তিনি হিসাব করে বলেন, “১ কেজি ইলিশ কিনতে হলে আমাকে টানা ৪-৫ দিনের পুরো আয় জমা করতে হবে। সংসারের বাকি খরচ বন্ধ রেখে তা তো সম্ভব নয়। তাই কিনতে না পারলেও শুধু দাম শুনে হতাশ হয়ে ফিরে যাই।”
শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আয়া হোসনে আরা বেগমের আফসোস আরও গভীর। মাসে মাত্র তিন হাজার টাকা বেতনে কাজ করা এই নারী জানান, একটা ইলিশ কিনতে গেলে তার পুরো মাসের বেতন চলে যাবে। আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ইলিশ তো সাগরের মাছ, একে খাইয়ে-পরিয়ে বড় করতে হয় না। তবে এর দাম এত বেশি কেন? আমরা গরীবরা কি আর কোনোদিন ইলিশ খেতে পারব না?”
অথচ শ্রমজীবীদের এই হতাশার বিপরীত চিত্র দেখা যায় বিত্তবানদের কেনাকাটায়। বাজারে আসা এক বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মেহেদি হাসান একাই কেনেন ১৭ কেজি ইলিশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এনজিও কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজারে ইলিশের সরবরাহ থাকলেও তা চলে যাচ্ছে উচ্চবিত্তদের ফ্রিজে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সাধন কুমার দেবনাথ বলেন, “বাজারে প্রচুর ইলিশ আসছে সত্য, তবে তা সাধারণ মানুষের জন্য নয়। দাম যাই হোক, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী গাড়ি ভরে ইলিশ কিনে ডিপ ফ্রিজে জমা করছে। বাজারের এই চড়া ভাব ইলিশকে সাধারণের নাগালের বাইরে নিয়ে গেছে।”
একই সুরে কথা বলেন, শহরের রবীন্দ্রনাথ সড়ক নলডাঙা রোডের বাসিন্দা শফিকুজ্জামান। তিনি বলেন ধীরে ধীরে সাধারণের পাত থেকে ইলিশ মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। যেখানে নিত্য প্রয়োজন মেটাতে মানুষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে সেখানে ইলিশ যেন ছেড়া কাঁথায় শুয়ে স্বপ্ন দেখার শামিল।
ইলিশ মাছ বিক্রেতা আব্দুল জলিল জানান, গত দু চারদিনে ইলিশের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দাম তেমন একটা কমেনি।
আব্দুল জলিল আরো জানান, বেশির ভাগ আমার পরিচিত ক্রেতারা ফোন করে এসে মাছ নিয়ে যান। ভালো মানের মাছ পেলে তাদের ফোন করলে এসে নিয়ে যান। এর বাইরে সাধারণ কিছু ক্রেতাও আছেন।
আরেক বিক্রেতা এরশাদ আলী বলেন, ভাই আমার কাছে সব পাথরঘাটার ইলিশ। আমাকে ভালো দাম দিলে ভালো মাল পাবেন এই নিশ্চয়তা আমি দিই।
এদিকে, বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে ৩ কেজি সাইজের রুই কেজি প্রতি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, ৩ কেজি সাইজের কাতলা ৪০০ টাকা, পাবদা ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা, হরিণা চিংড়ি ৮৮০ থেকে ৯০০ টাকা, চাকা চিংড়ি ৯০০ টাকা, বাগদা চিংড়ি ৮০০ টাকা, পারশে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, শিং ৪০০ টাকা, বেলে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, পুঁটি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, চাপলে ৪০০ টাকা, কৈ ১৮০ থেকে ৩০০ টাকা, বাইন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, নাইলোটিকা ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা, টাকী ৪০০ থেকে ৫২০ টাকা, টেংরা ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা ও পাঙাশ ১৭০ থেকে ৩০০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
শহরের সিটি কলেজ পাড়ার বাসিন্দা রাফিউল করিম বলেন, সব রকম মাছের গায়ে আগুন। সাধ্যের মধ্যে রয়েছে কেবল মুরগি।
মাছ বিক্রেতা রতন বিশ্বাস বলেন, শুক্রবারের বাজার হিসেবে বেচাকেনা ভালো। এড়াছা ইলিশের সরবরাহ বৃদ্ধি পাবার জন্য স্বাদু পানির মাছের দাম কিছুটা কমতির দিকে। তবে বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে রুই কাতলার দাম।
মুরগির বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা, লেয়ার ৩৭০ থেকে ৪০০ টাকা ও সোনালি ২৬০ থেকে ২৮০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
সাদ্দাম ব্রয়লার হাউসের স্বত্বাধিকারী সাদ্দাম মোল্লা বলেন, পাইকারিতে সব রকম মুরগির দাম কেজিতে ১০/১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রভাব খুচরা পর্যায়ে পড়েনি।
এছাড়া গরুর মাংস ৭৭০ থেকে ৮০০ টাকা ও খাসীর মাংস ১১৫০ থেকে ১২০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে।
যশোর বিফ হাউসের স্বত্বাধিকারী শেখ শওকত আলী বলেন, গরুর মাংসের দাম স্থিতিশীল থাকলেও হাটে গরুর দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনটা চলতে থাকলে খুচরা পর্যায়ে দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।
সবজির বাজার কালীবাড়ি রোড ও নিচের বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে মানভেদে বরবটি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কচুর লতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কচুরমুখি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, মানকচু ৫০ টাকা, শসা ৭০ থেকে ৮০ টাকা, কাঁচকলা ৩০ থেকে ৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১০০ থেকে ১২০ টাকা, পুঁইশাক ২৫ থেকে ৩০ টাকা, সবুজ শাক ৩০ থেকে ৪০ টাকা, টমেটো ১০০ থেকে ১২০ টাকা, কুশি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা, মিষ্টি কুমড়ো ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ডাটা ৩০ টাকা, ধুন্দল ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ঝিঙে ৬০ থেকে ৭০ টাকা, করলা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, উচ্ছে ৮০ টাকা, পটল ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ভেন্ডি ৪০ থেকে ৬০ টাকা, কাকরোল ৬০ টাকা, আমড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা, ওল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, পেঁপে ২০ টাকা, লাউ ও চাল কুমড়ো আকারভেদে ৩০ থেকে ৫০ টাকা, লেবু হালি প্রতি ২০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
এছাড়া আগাম শীতকালীন সবজি ফুলকপি কেজি প্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকা, শিম ১৬০ টাকা, মিচুড়ি ১০০ টাকা, বাঁধাকপি ৬০ থেকে ৮০ টাকা ও পালং শাক ৬০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
সবজি বিক্রেতা রনি রায় বলেন, এ সপ্তাহে সবজির দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকার পার্টিদের চাহিদা বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কম থাকায় দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
মাওলানা মোহাম্মদ আলী সড়কের আসিফ খান তূর্য্য বলেন, সবজি থেকে মাছ কোনটির দাম নাগালে নেই। ৫০ টাকার উপরে অধিকাংশ সবজির দাম।
মুদিপণ্যের বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল কেজি প্রতি ২০৫ থেকে ২১০ টাকা, সরিষার তেল ২৩০ থেকে ২৪০ টাকা, পাম তেল থেকে ১৮৬ টাকা, সুপার তেল ১৯০ টাকা, পোলাও চাল ১৭০ থেকে ২৪০ টাকা, আটা ৪৫ থেকে ৪৮ টাকা, ময়দা ৬২ থেকে ৭০ টাকা, মুগ ডাল ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, মসুরির ডাল ১০০ থেকে ১৬০ টাকা, ছোলার ডাল ১০০ থেকে ১১০ টাকা, বুটের ডাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, সাদা চিনি ১১০ টাকা, লাল চিনি ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা, আলু ২৫ টাকা, পেঁয়াজ ৫০ টাকা, রসুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা ও আদা ১৬০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
মুদিপণ্য বিক্রেতা মানিক স্টোরের স্বত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ২/১ টাকা করে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক কোম্পানি দাম বৃদ্ধি না করে ওজন কমিয়ে দাম ঠিক রেখে বাজারে পণ্য ছাড়ছে, যা সাধারণ ক্রেতারা ধরতে পারছে না। তাছাড়া বোতলজাত সয়াবিন তেলে সব কোম্পানি দাম বৃদ্ধি করে বাজারে ছেড়েছে।
চালের বাজার ঘুরে দেখা গেছে বর্তমানে মিনিকেট ৫৫ থেকে ৬০ টাকা, পাইজাম ৪৯ টাকা, বাসমতি ৭৫ থেকে ৮০ টাকা, আটাশ ৫২ থেকে ৫৫ টাকা,
সুবর্ণলতা ৫৫ টাকা, নূরজাহান ৫০ টাকা, নাজিরশাল ৯৫ টাকা ও বিল আমন ৬০ টাকা, বিক্রি হয়েছে।
চালের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান মেসার্স লোকনাথ ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী অজয় কুমার সাউ বলেন, বাজার অস্থিতিশীল হবার কোন কারণ নেই। আবার বেচাকেনাও ভালো না।
ডিমের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে লাল ডিম হালি প্রতি ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা, সাদা ডিম ৪২ থেকে ৪৪ টাকা, হাঁসের ডিম ৬৮ থেকে ৭২ টাকা, দেশি মুরগি ডিম ৭২ টাকা ও কোয়েল পাখির ডিম ১২ টাকা বিক্রি হয়েছে।
ডিমের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান খালধার রোডের আনিছ এন্টারপ্রাইজের পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, দাম স্থিতিশীল রয়েছে। আবহাওয়া ঠিক থাকলে দাম বৃদ্ধি পাবার আশংকা নেই। তবে খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পেলে ডিমের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে।
সবমিলে চাল, ডাল ও সবজির বাড়তি দামের চাপে যখন নিত্যদিন সংস্থান করতেই শ্রমজীবীরা হিমশিম খাচ্ছেন, তখন ইলিশ কেনা যেন সাধারণ মানুষের জন্য ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার শামিল।
