হিমেল খান
যশোর পৌরসভার শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প, কোটি কোটি টাকার ড্রেন পরিস্কার, খাল সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পরও সামান্য ভারি বৃষ্টিতেই পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে শহর। প্রধান সড়ক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিবন্দি থাকছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থের প্রকৃত সুফল কোথায়?
সরেজমিন পরিদর্শন, পৌরসভার নথি এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সমস্যা সমাধানে শুধু ড্রেন পরিস্কার বা নতুন ড্রেন নির্মাণে সীমাবদ্ধ নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী-খাল-বিল দখল, প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ পরিকল্পনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সমন্বয়হীনতাই যশোরের জলাবদ্ধতাকে স্থায়ী সংকটে পরিণত করেছে।
কোটি টাকা ব্যয়, সুফল কোথায়?
যশোর পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, গত দুই অর্থবছরে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৪৭ কিলোমিটার ড্রেন পরিস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। এর আগে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে শহরের ৬৩ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে আরও প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কয়েক ঘণ্টার টানা বর্ষণেই টিবি ক্লিনিক এলাকা, খড়কি শাহ আব্দুল করিম সড়ক, আপন মোড়, রূপকথা মোড়, ধর্মতলা, চারখাম্বা, মুজিব সড়কের রেলগেট, নাজির শংকরপুর, বেজপাড়া চিরুনিকল মোড়, মিশনপাড়া, আরবপুর, বিমানবন্দর সড়ক, শংকরপুর চোপদারপাড়া, স্টেডিয়ামপাড়া, বকচরসহ অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি এলাকা জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন ৫, ৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দারা।
প্রকল্প হয়েছে, মাস্টারপ্ল্যান হয়নি
পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, যশোরে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও পুরো শহরের জন্য সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে কোথাও নতুন ড্রেন নির্মাণ হলেও তার সঙ্গে পুরোনো ড্রেন, খাল কিংবা নদীর সংযোগ কার্যকর না থাকায় পানি দ্রুত বের হতে পারে না। হারিয়ে গেছে শহরের প্রাকৃতিক জলাধার
পৌর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, একসময় যশোর শহরের বৃষ্টির পানি আশপাশের নিচু জমি, খাল, পুকুর ও বিলে গিয়ে জমা হতো। কিন্তু পরিকল্পনাহীন নগর সম্প্রসারণে সেই জলাধারগুলো ভরাট হয়ে গেছে।
তার মতে, প্রকৃতির স্বাভাবিক পানি ধারণক্ষম এলাকাগুলো কংক্রিটে ঢেকে দেওয়ায় এখন সামান্য বৃষ্টিতেই পানি আটকে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
ভৈরব ও মুক্তেশ্বরীর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন ড্রেনেজ
সনাক যশোরের সাবেক সভাপতি সাইফুজ্জামান মজু বলেন, শহরের পানি নিস্কাশনের প্রধান দুই মাধ্যম ভৈরব ও মুক্তেশ্বরী নদী। কিন্তু দীর্ঘদিনের দখল, ভরাট ও নাব্যতা সংকটের কারণে নদীর সঙ্গে ড্রেনের সংযোগ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ড্রেন পরিস্কার করলেই হবে না। শেষ পর্যন্ত সেই পানি কোথায় যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ড্রেন আছে, কিন্তু পানি নামার পথ নেই
সিপিবি নেতা আমিনুর রহমান হিরু বলেন, অনেক ড্রেনের লেভেল সঠিক নয়। কোথাও ড্রেন উঁচু, কোথাও নিচু। আবার ব্রিটিশ আমলের বহু কালভার্ট বন্ধ হয়ে গেছে কিংবা মুখ ভরাট হয়ে আছে। খড়কি, গাজীর বাজার ও শংকরপুর টার্মিনাল এলাকায় ড্রেনের মুখ সংকুচিত হওয়ায় পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিল হরিণাও হারাচ্ছে অস্তিত্ব
যশোর সরকারি এমএম কলেজের সাবেক অধ্যাপক সোলজার রহমান বলেন, বিল হরিণা শহরের অন্যতম প্রাকৃতিক পানি ধারণ এলাকা। কিন্তু বছরের পর বছর ভরাট ও দখলের কারণে সেই সক্ষমতা প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে।
তার মতে, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদী, খাল, বিল ও জলাধার পুনরুদ্ধার ছাড়া এই সংকট আরও বাড়বে।
অনুসন্ধানে যা মিলেছে
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিল হরিণার সঙ্গে সংযুক্ত অধিকাংশ খাল দখল বা ভরাট হয়ে মাছের ঘের। কোথাও আবার বাধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিক প্রবাহে বের হওয়ার সুযোগ হারিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের অধিকাংশ ওয়ার্ডের পানি এসে জমা হয় ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। ফলে প্রতি বর্ষায় ওই এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ করে বলেন, শহরের পানি দ্রুত ভৈরব ও মুক্তেশ্বরী নদীতে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না হলে এই সংকট কখনও দূর হবে না। পাশাপাশি শহরের ড্রেনগুলো প্রসস্ত নয়। ফলে পানি স্বাভাবিক ভাবে অপসারণ হতে পারে না।
অর্থ ব্যয় বাড়ছে, দুর্ভোগও বাড়ছে
বর্ষা এলেই হাজারো পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। দোকানপাট বন্ধ রাখতে হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি কমে যায়, যান চলাচল ব্যাহত হয়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় সড়ক দ্রুত নষ্ট হয় এবং ডেঙ্গুসহ পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
উন্নয়ন নাকি অর্থের অপচয়?
ভৈরব নদ বাঁচাও আন্দোলন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল মানুষের দুর্ভোগ কমানো। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
তার অভিযোগ, কোটি কোটি টাকার প্রকল্প হলেও নদী-খাল-বিল রক্ষা, পানি প্রবাহ নিশ্চিত এবং স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে প্রকল্প শেষ হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
পৌরসভার বক্তব্য
যশোর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ হোসেন বলেন, দুই বছরে ২৪৭ কিলোমিটার ড্রেন পরিস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে খড়কি, চোরমারা দীঘিরপাড়সহ কয়েকটি এলাকায় ড্রেন ও সড়ক সংস্কার এবং পালবাড়ি থেকে চাঁচড়া পর্যন্ত খাল খননের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, স্পটভিত্তিক সমস্যাগুলো সমাধানে ধাপে ধাপে কাজ এগোচ্ছে। চলমান প্রকল্পগুলো শেষ হলে জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নগরবাসীর প্রশ্নের জবাব কে দেবে?
প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্য—অল্প বৃষ্টিতেই অচল শহর, পানিবন্দি মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়-শত কোটি টাকার প্রকল্প, কোটি কোটি টাকার ড্রেন পরিস্কার এবং বারবার সংস্কারের পরও যদি যশোরবাসী প্রতি বছর একই জলাবদ্ধতার শিকার হন, তবে সেই উন্নয়নের প্রকৃত সুফল কোথায়?
নগরবাসীর প্রত্যাশা, নতুন প্রকল্প ঘোষণার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান, নদী-খাল-বিল দখলমুক্ত করা, জলাধার পুনরুদ্ধার, প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা এবং ব্যয়ের স্বাধীন নিরীক্ষা। অন্যথায় বর্ষা এলেই একই দুর্ভোগ, একই প্রতিশ্রুতি এবং একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকবে।

