বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানিয়েছেন যশোরের এক সংলাপে অংশ নেয়া নিয়োগদাতা ও ব্যবসায়ী নেতারা।
কেন্দ্রীয়ভাবে প্রণীত কর্মসূচির সঙ্গে এ অঞ্চলের ব্যবসায়িক বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরে তারা প্রশ্ন করেন, বিদ্যমান সহায়তা তরুণদের কর্মসংস্থান ও ব্যবসা শুরুর জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে পারছে কি না।
“বাংলাদেশে তরুণদের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা: সুযোগ, অংশগ্রহণের পথ ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন (টিএএফ) যৌথভাবে এই নিয়োগদাতা ও ব্যবসায়ী সংলাপের আয়োজন করে।
সংলাপ সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ এম. হাসেমী। আলোচনায় অংশ নেন রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ফাউন্ডেশনের (আরআরএফ) নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ বিশ্বাস, যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মিজানুর রহমান খান, পরিচালক ও এমইউ সি ফুডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্যামল দাস, চেম্বারের পরিচালক খাইরুল কবির চঞ্চল, নারী উদ্যোক্তা শামসুন্নাহার পান্না প্রমুখ।
প্রশিক্ষণ শেষে কী হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনার বড় একটি অংশজুড়ে প্রশ্ন ওঠে। অংশগ্রহণকারীরা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দুর্বল সমন্বয় এবং প্রশিক্ষণার্থীরা নিজ নিজ বিষয়ে কাজ পাচ্ছেন কি না, তা জানার জন্য সীমিত অনুসরণের কথা বলেন। প্রশিক্ষণ-পরবর্তী আয় ও জীবিকা সম্পর্কিত তথ্যও সহজে পাওয়া যায় না। নিয়োগদাতারা স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের দাবি জানান। এর মধ্যে বিশেষায়িত কারিগরি মেরামত, নকশা ও সেবাসংক্রান্ত দক্ষতার কথা উঠে আসে।
অধ্যাপক সৈয়দ এম. হাসেমী বলেন, “প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা প্রায়ই ওপর থেকে আসে। কিন্তু সেই দক্ষতার বাজার চাহিদা আছে কি না, তা কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে কি না-সেখানে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।”
কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ফিলিপ বিশ্বাস। তিনি বলেন, “মাঠপর্যায়ে নিয়োগদাতা ও বাজারের অবস্থা যাচাই না করে ঢাকায় বসে কর্মসূচি তৈরি করা হলে, বাস্তবায়নের মনোযোগ প্রাসঙ্গিক দক্ষতা গড়ে তোলার বদলে বাজেট খরচের দিকে চলে যায়।”
যারা ব্যবসা শুরু করতে চান, তাদের জন্য অর্থায়ন আরও কিছু বাধা তৈরি করছে। উদ্যোক্তারা ঋণের উচ্চ ব্যয় ও জামানতের কঠোর শর্তের কথা জানান। কয়েকজন রপ্তানিকারক বলেন, ঋণের সুদহার ১৪-১৬ শতাংশ, যা বহন করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন। অংশগ্রহণকারীরা সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের উপযোগী ঝুঁকি পুঁজি ও ঋণসুবিধার পাশাপাশি ব্যবসা গড়ে তোলা ও পরিচালনায় বাস্তবভিত্তিক সহায়তার আহ্বান জানান।
নারীদের ক্ষেত্রে রয়েছে বাড়তি বাধা। অংশগ্রহণকারীরা জানান, স্থানীয় উদ্যোগ হিসেবে বিউটি পার্লার ভূমিহীন ও স্বামীপরিত্যক্তা নারীসহ অসহায় অবস্থায় থাকা নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে। অথচ ছোট ব্যবসার জন্য ঋণ চাইলে তাদের স্বামীকে জামিনদার করা বা জামানত হিসেবে জমির দলিল দেয়ার শর্ত দেয়া হচ্ছে বলে তারা জানান। যেসব নারীর নিজের নামে সম্পত্তি নেই বা স্বামীর সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই, তাদের ঋণপ্রাপ্তি এসব শর্তে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নারীর নামে ঋণ নেয়া হলেও কার্যত তা স্বামীর নিয়ন্ত্রণে থাকা ও তার কাজে ব্যবহৃত হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় উঠে আসে।
যশোরের ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোর ওপর চাপ নিয়েও আলোচনা হয়। অংশগ্রহণকারীরা জানান, অন্য এলাকায় যন্ত্রে সেলাই করা পণ্য “যশোর স্টিচ” নামে রপ্তানি হচ্ছে। এতে স্থানীয় হাতে সেলাই করা সূচিকর্ম ও নকশিকাঁথার বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং কারুশিল্পীদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।
ফুল খাতের আলোচনায় আমদানি করা প্লাস্টিকের ফুলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং কেন্দ্রীয় বাজার, গবেষণা সহায়তা, মান অনুযায়ী বাছাই ও শ্রেণিবিন্যাস এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার ঘাটতির কথা উঠে আসে। অংশগ্রহণকারীরা যশোর আইটি পার্কের কার্যকর ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
শ্যামল দাস বলেন, “এ অঞ্চলের রপ্তানির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু পূর্বানুমানযোগ্য নীতি, ব্যবহারিক দক্ষতা এবং বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের অনুকূল পরিবেশ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।”
লাইসেন্সের শর্ত নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন অংশগ্রহণকারীরা। একজন জানান, যশোরে একটি রেস্তোরাঁ চালু করতে ১১টি পৃথক লাইসেন্স প্রয়োজন হয়। প্রতিনিধিরা চশমাসহ অপটিক্যাল পণ্য, ইটভাটা ও সেবা ব্যবসার ওপর প্রভাব ফেলা নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সমস্যাও তুলে ধরেন।
ব্যবসা চালুর আগেই উদ্যোক্তাদের যেসব সমস্যার মুখে পড়তে হয়, সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মিজানুর রহমান খান। তিনি বলেন, “ব্যবসা শুরুর আগেই যেন একজন নতুন উদ্যোক্তা উদ্যোগ নেয়ার ইচ্ছা হারিয়ে না ফেলেন। লাইসেন্স, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও অর্থায়নকে সহায়ক হতে হবে, প্রবেশের মুখেই বাধা হয়ে দাঁড়ালে চলবে না।”
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, আলোচনায় জাতীয় নীতিপরিকল্পনার সঙ্গে স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতার গুরুতর ব্যবধান উঠে এসেছে। প্রশিক্ষণ সনদের ওপর জোর দেয়ার গণ্ডি পেরিয়ে সরকারি ও দাতা-অর্থায়িত কর্মসূচি প্রকৃত কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি ও নতুন উদ্যোগ সৃষ্টিতে কতটা ভূমিকা রাখছে, তার ভিত্তিতে মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, “প্রশিক্ষণ দেয়াকেই চূড়ান্ত লক্ষ্য ধরে অর্থায়ন করার বদলে কাজ ও উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার বাস্তব পথ তৈরিতে সহায়তা করতে হবে। অর্থনীতির শিকড়ের বাস্তবতা থেকেই নীতিগত করণীয় নির্ধারিত হতে হবে।”
যশোরের আলোচনায় উঠে আসা বিষয়গুলো বাংলাদেশে তরুণদের অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে পিপিআরসি-টিএএফের বৃহত্তর গবেষণায় কাজে লাগবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তরুণদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ, যুক্ত হওয়ার বাস্তব পথ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাধা অনুসন্ধান করছে এই গবেষণা।
