“সংগৃহিত নমুনা ফেলে দেয়া হয় ড্রেন কিংবা ডাস্টবিনে। বাড়িতে বসে তৈরির পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সিল স্বাক্ষরিত ভুয়া রিপোর্ট ধরিয়ে দেয়া হয় রোগীকে”
কাজী নূর :
রোগ নির্ণয়ে একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় ভরসা প্যাথলজি রিপোর্ট। সেই রিপোর্টের ওপর নির্ভর করেই নির্ধারিত হয় রোগীর চিকিৎসা, ওষুধ কিংবা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা। অথচ যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে সেই জীবনরক্ষাকারী প্যাথলজি রিপোর্টকেই ভয়াবহ প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হাসপাতালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সংঘবদ্ধ চক্র ভর্তি রোগীদের রক্ত, প্রস্রাবসহ বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে প্রকৃত পরীক্ষাগারে না পাঠিয়ে ফেলে দিচ্ছে।
পরে কম্পিউটারে বসে ভুয়া প্যাথলজি রিপোর্ট তৈরি করে রোগীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। ফলে ভুল রিপোর্টের ভিত্তিতে ভুল চিকিৎসার শিকার হচ্ছেন রোগীরা। এতে যেকোনো সময় ঘটতে পারে প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনা।
দৈনিক বাংলার ভোর-এর দীর্ঘ অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে। জানা গেছে, ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়ার পরই রোগীদের টার্গেট করে চক্রটি। নিজেদের হাসপাতালের স্টাফ, স্বেচ্ছাসেবক কিংবা ল্যাবের কালেকশন ম্যান পরিচয় দিয়ে তারা রোগী ও স্বজনদের আস্থা অর্জন করে।
কম খরচে এবং অল্প সময়ে পরীক্ষা করিয়ে রিপোর্ট এনে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সংগ্রহ করা হয় পরীক্ষার অর্থ। এরপর রোগীর রক্ত, প্রস্রাব বা অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ প্রকৃত পরীক্ষাগারে পাঠানোর পরিবর্তে ফেলা হয় ড্রেন কিংবা ডাস্টবিনে। এরপর কম্পিউটারে জাল রিপোর্ট তৈরি করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সিল-স্বাক্ষর ব্যবহার করে তা রোগীদের হাতে তুলে দেয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সদর উপজেলার হাশিমপুর এলাকার একটি বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটার, প্রিন্টার, বিভিন্ন হাসপাতালের প্যাড এবং চিকিৎসকদের সিল ব্যবহার করে জাল প্যাথলজি রিপোর্ট তৈরি করা হতো।
রোগী বা তার স্বজনের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালের প্যাডে রিপোর্ট ছাপিয়ে তাতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সিল-স্বাক্ষর জাল করে মোটরসাইকেলের মাধ্যমে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়া হতো। গত এপ্রিল মাসের পর ওই কার্যক্রম অন্য একটি গোপন স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, এই চক্রের জন্য রোগী সংগ্রহের প্রথম ধাপে কাজ করেন হাসপাতালের কয়েকজন স্টাফ ও স্বেচ্ছাসেবক। অভিযোগ রয়েছে, চতুর্থ তলার ১২ নাম্বার পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডের খাইরুল ইসলাম, ১৩ নাম্বার পুরুষ পেয়িং ওয়ার্ডের লিটন দাস, তৃতীয় তলার মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের সোনিয়া, দ্বিতীয় তলার মডেল সার্জরি ওয়ার্ডের নাজমুল ইসলাম, করোনারি কেয়ার ইউনিটের দেবাশীষ ও প্রসেনজিৎ রোগী শনাক্ত করে চক্রটির কাছে পৌঁছে দিতেন।
চক্রটির নেতৃত্বে সদর উপজেলার ইছালী ইউনিয়নের রাকিবুল ইসলাম ও তুষার নামে দুই ব্যক্তি। তাদের সহযোগী হিসেবে সানি, আব্দুল্লাহ, সোহান, শাহরিয়ার, রাশেদ হুজুর ও রায়হানের নামও উঠে এসেছে।
জানা গেছে, এই প্রতারণার অর্থনৈতিক কাঠামোও ছিল সুসংগঠিত। যে ব্যক্তি রোগী ধরিয়ে দিতেন, তাকে পরীক্ষার বিলের ৪০ শতাংশ কমিশন দেয়া হতো। অবশিষ্ট অর্থ থেকে অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে ভাগাভাগি করতেন চক্রের সদস্যরা।
মোটরসাইকেলের জ্বালানি, কাগজ, কালি ও সিল ছাড়া তাদের তেমন কোনো ব্যয় ছিল না। ফলে প্রতিদিনই হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হতো বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চক্রটির অন্যতম হোতা রাকিবুল ইসলাম একসময় শহরের মুজিব সড়কের একটি বেসরকারি হাসপাতালের মার্কেটিং অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই সময় থেকেই তিনি যশোর জেনারেল হাসপাতালকে কেন্দ্র করে এই জাল প্যাথলজি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। শুরু থেকেই তাকে সহায়তা করেন কয়েকজন হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। পরে অধিক লাভের আশায় আরও অনেকে এই চক্রে যুক্ত হন।
এদিকে একজন পুলিশ সদস্যের স্ত্রীর ভুয়া মেডিকেল রিপোর্ট সরবরাহের অভিযোগে ল্যাব টেকনিশিয়ান রাকিবুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার আটকের পর চক্রের অন্য সদস্যরা আত্মগোপনে চলে গেছেন বলেও জানা গেছে।
হাসপাতালের একটি সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন একই ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করায় অভিযুক্তদের একটি শক্ত নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে একই স্বেচ্ছাসেবকদের ওয়ার্ডে রাখার কারণে তাদের অপতৎপরতা চালানো সহজ হয়েছে।
সূত্রটির দাবি, ওয়ার্ড মাস্টার ওবায়দুল ইসলাম কাজল ও জমাদ্দার ইমরানের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন একই ব্যক্তিদের দায়িত্বে রাখা হয়েছে। নিয়মিত ডিউটি রোস্টার পরিবর্তন এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা হলে এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকাংশে বন্ধ করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যশোর মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবুল হাসান বলেন, আমিও এই প্রতারক চক্রের শিকার। কয়েক মাস আগে আমার নামের সিল এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালের প্যাড জাল করে রোগীকে ভুয়া প্যাথলজি রিপোর্ট দেয়া হয়েছিল। বিষয়টি জানার পর কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ করা হয়।
তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক প্যাথলজি রিপোর্টের ওপর নির্ভর করেই রোগীর চিকিৎসা নির্ধারণ করেন। সেই রিপোর্ট যদি জাল হয়, তাহলে ভুল চিকিৎসায় রোগীর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে পারে। অর্থের লোভে যারা এমন ভয়ঙ্কর প্রতারণা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
এ বিষয়ে যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আহসান কবির বাপ্পী বলেন, আমি দায়িত্বে আসার পূর্বে এ হাসপাতালে একজন চিকিৎসকের সিল স্বাক্ষর জালিয়াতি করে একটি বেসরকারি ক্লিনিকের প্যাডে প্যাথলজির রিপোর্ট প্রদানের ঘটনা ঘটেছিল। যা নিয়ে পরবর্তীতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
ডা. বাপ্পী আরও বলেন, রোগী সাধারণ যেন আমাদের সেবায় সন্তুষ্ট হয়ে ঘরে ফিরতে পারেন আমি সেই চেষ্টা করছি।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, আসলে এ জাতীয় ঘটনা ধরা না পড়লে বোঝা মুশকিল আসলে কি হচ্ছে, কে বা কারা প্রতারণার সাথে জড়িত। এজন্য রোগী বা তার স্বজনদের সতর্ক হতে হবে। সেই সঙ্গে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইনগত পদক্ষেপ নিলে প্রতারকরা হাসপাতালে ভিড়বে না।

