বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
যশোরের পাড়ায় মহল্লায় মাদকের ব্যপকতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মরণ নেশার ছোবলে তরুণ ও যুবসমাজ ধ্বংসের পথে। যা দেশের সার্বিক ভবিষ্যৎকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নিঃশ্বেষ হচ্ছে বহু পরিবার। মাদকের টাকা জোগাড় করতে মাদক সেবির হাতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে অহরহ। ভয়াবহ পরিস্থিতির পরও মাদক নিমূল করা সম্ভব হচ্ছে না।
পুলিশ প্রশাসন নাম মাত্র অভিযান চালিয়ে কয়েকজন মাদক ব্যাবসায়িকে আটক করলেও রাঘব বোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোয়ার বাইরে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন পাড়ায় মহল্লায় মাদকের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে বৃদ্ধি পেয়েছে মাদক সেবির সংখ্যাও। শহরের ঘোপ, বারান্দিপাড়া, মোল্লাপাড়া,বেজপাড়া,বকচর, শংকরপুর, আরএন রোড, খালধার রোড,কারবালা, খড়কি, পালবাড়ি, কাজীপাড়া, ও শহরতলীর ফতেপুর, চাঁচড়া,শেখহাটি, বিরামপুর, উপশহর এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা হচ্ছে।
মাদক বিক্রির সাথে রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতাকর্মী জড়িত আছে বলে অভিযোগ আছে। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আশ্রয় প্রশয়ে এ সব পাড়া মহল্লায় মাদক বিক্রি হচ্ছে বলে স্থানীয়য় জানান। অনেক পাড়া মহল্লায় রাজনৈতিক দলের পাতি নেতাকর্মীরা সরাসরি মাদক বিক্রির সাথে যুক্ত। পুলিশ প্রশাসন মাঝে মধ্যে নামমাত্র অভিযান চালিয়ে কয়েকজন মাদক বিক্রেতা ও সেবিকে আটক করলেও রাঘব বোয়ালরা থেকে যাচ্ছে আড়ালে।
এতে মাদকের মরণ নেয়ায় ধ্বংস হচ্ছে যুব সমাজ। নিশ্বেষ হচ্ছে অসংখ্য পরিবার। সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ উপায়ে মাদকের অনুপ্রবেশ এবং স্থানীয় পর্যায়ে এর সহজলভ্যতা আসক্তি বাড়ার প্রধান কারণ বলে মনে করছেন সচেতন মহল। বিভিন্ন সুত্রে জানা যায়, পুলিশ প্রশাসন ও সীমান্ত রক্ষি বাহিনী বিজিবির সহযোগিতায় সীমান্তের চোরাই পথ দিয়ে প্রতিদিনই অসংখ্য পরিমান মাদক দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে।
এর মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ট্যাপেনটাডাল ট্যাবলেট, গাজা, হেরোইন, ফেনসিডিল, মদ ও বিয়ার। প্রতিদিনই মিয়ানমার থেকে চট্রগ্রাম সীমান্তের চোরাই পথ দিয়ে এবং যশোরের বেনাপোল পেট্রাপোল, সাতক্ষীরার ভোমরা, দর্শনার গেদে সীমান্তের চোরাই পথ দিয়ে প্রতিদিনই বিপুল পরিমান মাদক দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। এ সব মাদক দ্রব্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের পর খুচরা ও পাইকারি মাদক ব্যবসায়িদের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে।
মাদক ব্যবসার সাথে কারা জড়িত কি ভাবে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে এসব কিছুই পুলিশ প্রশাসনের নখদর্পনে। পুলিশ নিজেদের দায় এড়াতে মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কয়েকজন মাদক ব্যবসায়িকে আটক করে সাধারণ জনগনের আই ওয়াশ করছে। তবে সম্প্রতি যশোরের পুলিশ বেশ কয়েকটি মাদকের বড় চালান আটক করে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে গত ৩০ আগস্ট শহরের ঝুমঝুমপুর আদর্শপাড়া এলাকা থেকে ২৭ হাজার পিচ ইয়াবাসহ সিরাজুল ইসলাম রিপন নামে এক মাদক কারবারিকে আটক করে।
রিপন শার্শা উপজেলার বাঁগআচড়া নাভারণ পশ্চিমপাড়ার নজরুল ইসলামের ছেলে। এর আগে গত ২৯ আগস্ট ৪৯ বিজিবি বেনাপোল সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ২০ কেজি গাঁজা, শাড়ি, কম্বল ও ফুসকা উদ্ধার করে। অথচ এ ঘটনায় কেউ আটক হয়নি। সাধারণত বিজিবির অভিযানে মাদক করবারি বা মাদক বহনকারি আটকের সংখ্য নেই বললেই চলে।
বেসরকারি এক সাম্প্রতিক জরিপ ও পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী,দেশে মাদকের সামগ্রিক চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশে বর্তমানে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ৮০ থেকে ৮৫ লক্ষ। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই তরুণ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে মাদকের সংস্পর্শে এসেছে, যার বড় কারণ কৌতূহল ও মানসিক চাপ।
মাদকাসক্তদের মোট সংখ্যার প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ নারী, যা বিগত পাঁচ বছরের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আসক্তদের মধ্যে ৫৫% ইয়াবা ও আইস (ক্রিস্টাল মেথ), ২৫% গাঁজা, ১২% ফেনসিডিল এবং ৮% হেরোইনসহ অন্যান্য ইনজেকশনযোগ্য মাদক ব্যবহার করে। ডিটেইলড ক্রাইম ডাটা অনুযায়ী, দেশের বড় শহরগুলোতে ছিনতাই, চুরি ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনার প্রায় ৬৫% মাদকাসক্তির সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত।
মাদক প্রতিরোধের বিষয়ে যশোর কোতয়ালি থানার ওসি কবির হোসেন জানান, মাদকের বিষয়ে প্রতিদিন অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স। প্রতিটি ফাঁড়ি ক্যাম্পে মাদকের বিষয়ে কোন প্রকার ছাড় না দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিদর্শক ব্রজেন্দ্র নাথ গাইন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মাদক নির্মূলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে পাড়া-মহল্লায় লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্নভাবে মানুষকে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদককারবারিদের আটক করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দেয়া হচ্ছে। মাদক নির্মূলে এ ধরনের অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।
