হিমেল খান :
যশোরে এবার পাটের ফলন ভালো হলেও বাজারদর নিয়ে হতাশ কৃষকেরা। অনুকূল আবহাওয়ায় জেলার অধিকাংশ এলাকায় কাঙ্ক্ষিত ফলন হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে থাকছে সামান্যই। ফলে ভালো ফলন পেয়েও লোকসানের শঙ্কা কাটছে না তাদের।
এদিকে মাঠ থেকে পাট কেটে খাল, বিল, ডোবা ও জলাশয়ে জাগ দেয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। ভোর থেকে জমিতে পাট কাটার পর আঁটি বেঁধে তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নিকটবর্তী জলাশয়ে। সেখানে কয়েক দিন পানিতে ডুবিয়ে রাখার পর শুরু হচ্ছে পাট পচানো, আঁশ ছাড়ানো ও শুকিয়ে বাজারজাত করার প্রস্তুতি। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি নারী ও পুরুষ শ্রমিকরাও এসব কাজে যুক্ত রয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কোথাও কোমরসমান পানিতে নেমে কৃষকেরা পাটের আঁটি জাগ দিচ্ছেন। আবার কোথাও সদ্য কাটা পাট জলাশয়ের পাড়ে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। পাটের ভালো মানের আঁশ পাওয়ার আশায় নির্দিষ্ট সময় ও নিয়ম মেনে আঁটি পানিতে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন কৃষকেরা।
কৃষকেরা জানান, চলতি মৌসুমের শুরুতে এবং আষাঢ়-শ্রাবণে অতিবৃষ্টির কারণে কিছু জমির পাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় অধিকাংশ জমিতে ফলন ভালো হয়েছে। এতে ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিলেন তারা। কিন্তু বর্তমান বাজারদর সেই প্রত্যাশা পূরণ করছে না।
পাটচাষি পলাশ কুমার সরকার বলেন, পাট চাষে শুরু থেকেই নানা খরচ করতে হয়। জমি তৈরি, বীজ, সার, আগাছা পরিষ্কার, পরিচর্যা, পাট কাটা, আঁটি বাঁধা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানো—প্রতিটি ধাপেই শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয়। পাট কাটার মৌসুমে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় খরচ আরও বাড়ে। সব খরচ বাদ দিয়ে বর্তমান বাজারদরে পাট বিক্রি করে খুব বেশি লাভ থাকছে না।
আরেক কৃষক ইমান আলী বলেন, এবার পাটের ফলন ভালো হয়েছে। বৃষ্টিতে কিছুটা ক্ষতি হলেও পরে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। এখন পাট কেটে জাগ দেয়া হচ্ছে। তবে হাটে যে দাম পাওয়া যাচ্ছে, তাতেই বিক্রি করতে হচ্ছে।
দাম কিছুটা বাড়লে কৃষকেরা ভালোভাবে লাভবান হতে পারবেন। কৃষক দেবাশীষ পাল বলেন, পাট কাটার পর জাগ দেওয়া, পচানো ও আঁশ ছাড়াতেও অনেক শ্রম লাগে। সব খরচ শেষে বর্তমানে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে পাট বিক্রি হচ্ছে। এ দামে কৃষকের প্রত্যাশিত লাভ হচ্ছে না। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম বাড়ানো প্রয়োজন।

আঁশ ছাড়ানোর কাজে নারী শ্রমিক
পাটের মৌসুমে কৃষকের পাশাপাশি গ্রামীণ নারী শ্রমিকদেরও ব্যস্ততা বেড়েছে। পাটের আঁটি জলাশয়ে জাগ দেওয়া, পচা পাট থেকে আঁশ ছাড়ানো, আঁশ ধোয়া ও শুকানোর কাজে অনেক নারী শ্রমিক অংশ নিচ্ছেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পানিতে নেমে কাজ করতে হচ্ছে তাদের। এতে একদিকে যেমন বাড়তি আয় হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় পানিতে কাজ করার কারণে শারীরিক কষ্টও হচ্ছে বলে জানান তারা। তবে কঠোর পরিশ্রমের তুলনায় তাদের প্রাপ্তি খুবই সামান্য।
আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত একাধিক নারী শ্রমিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একটানা হাঁটু পানিতে বসে কিংবা রোদে পুড়ে কাজ করেও তারা দিনে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি মজুরি পান না। কখনওবা পাটকাঠি দিয়ে তাদের মজুরি পরিশোধ করা হয়।
যশোর সদরের নারী শ্রমিক রহিমা বেগম ও সকিনা খাতুন আক্ষেপ করে জানান, “পাট পচানি পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করায় হাত-পায়ের চামড়া উঠে যায়, চুলকানি ও ঘা হয়। এত কষ্টের পরও বাজারে সব পণ্যের যে দাম, তাতে মজুরি কিছুটা বাড়লে এই দুঃসময়ে পরিবারগুলোকে একটু টেনে তোলা সম্ভব হতো।”
ভালো আঁশের জন্য জাগ দেয়ার ওপর গুরুত্ব
সদর উপজেলার কৃষক হজরত আলী বলেন, পাটের আঁশ ভালো মানের হলে বাজারে কিছুটা বেশি দাম পাওয়া যায়। তাই জাগ দেয়ার সময়ও তারা পাটের মান ঠিক রাখার চেষ্টা করেন। সঠিকভাবে জাগ না হলে আঁশের মান কমে যেতে পারে। এতে বাজারে ভালো দাম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কৃষকদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতে পাটের দাম কম থাকায় অনেক সময় তারা বাধ্য হয়ে কম দামে পাট বিক্রি করেন। পরে বাজারে দাম বাড়লেও তখন কৃষকের হাতে আর পাট থাকে না। ফলে উৎপাদনের মূল সুবিধা চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। এ কারণে মৌসুমের শুরু থেকেই পাটের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কৃষকদের ভাষ্য, পাটের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা গেলে ভালো ফলনের সুফল সরাসরি কৃষকের ঘরে পৌঁছাবে। অন্যথায় উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের লাভ বাড়বে না।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ২৫ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে মোট ৬০ হাজার ৪৪৯ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে প্রায় ২ দশমিক ৪০ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের হিসাব করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, এ বছর জেলার পাটের ফলন ভালো হয়েছে।
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক আবুল হাসান বলেন, মৌসুমের বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া পাটের জন্য মোটামুটি অনুকূল ছিল। ফলে জেলার অধিকাংশ এলাকায় পাটের ফলন ভালো হয়েছে। বর্তমানে কৃষকেরা পাট কাটা ও জাগ দেয়ার কাজে ব্যস্ত রয়েছেন।
কৃষকদের প্রত্যাশা, এবার ভালো ফলনের পাশাপাশি পাটের ন্যায্য দামও নিশ্চিত হবে। বিশেষ করে সোনালি আঁশের ভালো ফলন পাওয়ার পর তারা উৎপাদন খরচ ও শ্রমের যথাযথ মূল্য চান। কৃষকদের মতে, পাটের দাম উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পর্যায়ে রাখা গেলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি পাট চাষেও আগ্রহ বাড়বে।
