হিমেল খান
শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতার শেষ হয়েছিলো ২১ অক্টোবর। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো যশোরেও ওই দিন প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুর্গোৎসব। তবে এর ব্যতিক্রম ঘটে যশোর সদর উপজেলার কৈখালি সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরে।
পূজায় ত্রুটি থাকার দাবি ওঠায় প্রতিমা বিসর্জন স্থগিত রেখে একই প্রতিমাকে সামনে রেখে দ্বিতীয় দফায় আয়োজন করা হয় দুর্গাপূজার। বৃহস্পতিবার থেকে ঘট পূজার মধ্য দিয়ে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন আয়োজকরা। শনিবার সন্ধ্যায় প্রতিমা বির্ষজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই আয়োজন।
শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মন্দিরটিতে এবারই প্রথম এমন ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও মন্দির কমিটির নেতারা।
যশোর শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কৈখালি গ্রাম। এই গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শত বছর ধরে প্রতি বছর দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছেন। এবারও যথারীতি পূজার আয়োজন করা হয়।
১৬ অক্টোবার থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত চলে পূজার বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা। বিজয়া দশমীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আয়োজক ও ভক্তরা। মন্দির প্রাঙ্গণে তখন উৎসবের আমেজ। নারীরা শুরু করেন সিঁদুর খেলা।
এর মধ্যেই ঘটে ব্যতিক্রমী ঘটনা। স্থানীয় এক নারী সবিতা রানী ঘোষের অস্বাভাবিক আচরণকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয়বার পূজার সিদ্ধান্ত নেন গ্রামবাসী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ওই নারীর ওপর দেবী দুর্গার ভর হয়েছিল। এ সময় তিনি পূজার নিয়ম পালনে ত্রুটি থাকার কথা বলেন বলেও দাবি করেন উপস্থিত ব্যক্তিরা।
স্থানীয়দের দাবি, ওই নারী পূজায় অশৌচ পালনরত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ এবং পুরোহিতের খাদ্যাভ্যাসের প্রসঙ্গ তুলে পূজার নিয়ম পালনে ত্রুটির কথা বলেন। সনাতন ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, পরিবারে সন্তান জন্ম বা কারও মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট সময় অশৌচ পালন করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এ ধরনের বিধি যথাযথভাবে মানা হয়নি বলে ওই নারী দাবি করেছিলেন। পুনরায় পূজা না করলে এলাকার মানুষের ক্ষতি হতে পারে, এমন কথাও বলা হয়েছিল বলে জানান তারা। ঘটনাটি উপস্থিত ভক্তদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। পরে গ্রামের মানুষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিমা বিসর্জন না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
কৈখালি গ্রামের বাসিন্দা বিদ্যুৎ রায় বলেন, সবিতা রানী ঘোষের বলা কথায় তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের মানুষের মঙ্গল কামনায় সবাই মিলে নতুন করে পূজার সিদ্ধান্ত নেন। সে অনুযায়ী, প্রতিমা বিসর্জন স্থগিত রেখে আবার পূজার আয়োজন করা হয়।
একই গ্রামের বাসিন্দা বিধান চন্দ্র রায় বলেন, সবাই যখন প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ঘটনাটি ঘটে। পরে গ্রামবাসীর সিদ্ধান্তে নতুন করে পূজার সব আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা সবিতা রানী ঘোষ বলেন, ওই সময় তার নিজের কোনো জ্ঞান ছিল না। পরে গ্রামবাসীর কাছ থেকে জানতে পারেন, তিনি পূজায় ত্রুটি থাকার কথা বলে পুনরায় পূজার আয়োজনের দাবি জানিয়েছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় কী ঘটেছিল, তা তিনি নিজে অনুভব করতে পারেননি। পরে অন্যদের কাছ থেকেই ঘটনার কথা জানতে পারেন।
মন্দির কমিটির সভাপতি মিলন রায় ও সাধারণ সম্পাদক গণেশ কুমার জানান, শত বছরের পূজার ইতিহাসে এবারই প্রথম এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন তারা। পূজার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর আবার আয়োজন করতে হওয়ায় বাড়তি খরচ হয়েছে। তবে এলাকার মানুষের মঙ্গল কামনা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান জানিয়ে দ্বিতীয়বার পূজার আয়োজন করা হয়। তাদের মতে, গ্রামের মানুষের সম্মিলিত সিদ্ধান্তেই এই আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।
তবে ধর্মীয় বিধিবিধানের দিক থেকে দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজার বিষয়টি নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ব্যাখ্যা। মন্দিরের পুরোহিত উজ্জ্বল কুমার বলেন, শাস্ত্রে দ্বিতীয় দফায় দুর্গাপূজার নিয়ম নেই। তবে এলাকার মানুষের মঙ্গল কামনায় ঘট স্থাপন করে পূজা করা হয়েছে। গ্রামবাসীর আগ্রহ ও বিশ্বাসের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই এ আয়োজন করা হয় বলে জানান তিনি।
যশোর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার ঘোষ বলেন, স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস ও মঙ্গল কামনাকে কেন্দ্র করে ব্যতিক্রমী এই আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে মানুষের বিশ্বাস ও অনুভূতি জড়িয়ে থাকে। কৈখালির ঘটনাটি সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকেই ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন।
দুর্গাপূজা সাধারণত নির্ধারিত তিথি ও ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে অনুষ্ঠিত হয়। বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে প্রতিমা বিসর্জন এবং উৎসবের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু কৈখালি গ্রামের এই মন্দিরে এবার সেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে একই প্রতিমাকে সামনে রেখে দ্বিতীয় দফায় পূজার আয়োজন করা হলো। এতে একদিকে যেমন বাড়তি ব্যয় ও আয়োজনের প্রয়োজন হয়েছে, অন্যদিকে গ্রামের মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।
বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুভূতির জায়গা থেকেই দ্বিতীয়বার দুর্গাপূজার আয়োজন করেছেন কৈখালির সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। পুরোহিতের ভাষ্য অনুযায়ী, শাস্ত্রে এমন আয়োজনের নিয়ম না থাকলেও স্থানীয় মানুষের মঙ্গল কামনায় ঘট পূজার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে এবারকার এই ঘটনা তাই স্থানীয়দের কাছে হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী। শনিবার সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দুই দফায় অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজার আয়োজন।
