বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
যশোর পৌরসভার পাড়া-মহল্লার সড়কগুলো দীর্ঘদিন ধরে বেহাল। কোথাও উঠে গেছে পিচঢালাই, কোথাও তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত।
বৃষ্টি হলেই এসব গর্তে জমে পানি; কাদা আর জলাবদ্ধতায় চলাচল হয়ে পড়ে দুর্বিষহ। শুষ্ক মৌসুমে আবার ধুলায় ছেয়ে যায় সড়ক। ভাঙাচোরা পথে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ। ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শিক্ষার্থী, পথচারী, রিকশা ও ইজিবাইকচালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, শহরে মোট ২৮৭ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে বিটুমিনের কার্পেটিং ১৭৬ কিলোমিটার, কংক্রিটের ৩০ কিলোমিটার, ইটের ৫১ কিলোমিটার এবং মাটির কাঁচা সড়ক ৩০ কিলোমিটার।
সড়কের সঙ্গে রয়েছে ২৫২ কিলোমিটার পয়োনিষ্কাশন নালা। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পৌর এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বকচর তাঁতিপাড়া সড়ক, শংকরপুর বাস টার্মিনাল সড়ক, চাঁচড়া বাজার মোড়, বেজপাড়া নলডাঙ্গা নতুন বাজার সড়ক, তালতলা কবরস্থান সড়ক এবং এম এম কলেজের দক্ষিণ গেটসংলগ্ন সড়কের বিভিন্ন অংশে পিচ উঠে ইটের খোয়া বেরিয়ে এসেছে। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে গভীর গর্ত।
সেসব গর্তে ভাঙা ইট ফেলে সাময়িকভাবে ভরাটের চেষ্টা করা হলেও তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চলাচলে আরও ভোগান্তি তৈরি করছে। এসব সড়ক দিয়ে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, ইজিবাইক, রিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে।
পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডেও একই চিত্র। ১ নম্বর ওয়ার্ডের ঢাকা রোড মসজিদ থেকে আমতলা মোড়, আমতলা থেকে ফুলতলা মোড়, নীলগঞ্জ শাহাপাড়া এবং পূর্ব বারান্দী মেইন রোড থেকে লিচুতলা ব্রিজ পর্যন্ত সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত। ২ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বারান্দী মেইন রোড, খালধার রোড ও কাঠেরপুল ব্রিজের দুই পাশের সড়কও বেহাল।
৩ নম্বর ওয়ার্ডের পিলুখান, ঘোপ সেন্ট্রাল ও ঘোপ নওয়াপাড়া সড়ক এবং ৪ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুল আজিজ সড়ক, আবু তালেব সড়ক, পালবাড়ি-খয়েরতলা সড়ক ও ঘোষপাড়া মেইন রোডের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৫ নম্বর ওয়ার্ডের হজরত বোরহান শাহ সড়ক, মিশনপাড়া, মুন্সি মেহেরুল্লাহ সড়ক, মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন সড়ক, খড়কির বামনপাড়া, ধোপাপাড়া, স্টেডিয়ামপাড়া, আপনমোড় ও কবরস্থান সড়কেও রয়েছে খানাখন্দ।
এ ছাড়া ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এমএম আলী, কেশবলাল, ভোলাট্যাংক ও ডালমিল সড়ক; ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আশ্রম ও ইসহাক সড়ক; ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পিয়ারী মোহন, বেজপাড়া মেইন, রেল রোড, বেজপাড়া নিউ এক্সটেনশন ও বিহারিপাড়া থেকে গোলগুল্লা মোড় পর্যন্ত সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের কোল্ড স্টোর মোড় থেকে নতুন বাস টার্মিনাল এবং নীলগঞ্জ তাঁতিপাড়া সড়কের অবস্থাও নাজুক।
বকচর তাঁতিপাড়া সড়কে চার বছর ধরে রিকশা চালান নিজাম উদ্দিন। তিনি বলেন, “বর্ষাকালে এই সড়কে চলাচল করা খুব কঠিন। এখন পর্যন্ত দুইবার যাত্রীসহ রিকশা উল্টে গেছে। গত বছর গর্তে জমে থাকা পানিতে রিকশা উল্টে এক নারী পথচারীর পা ভেঙে যায়। সরকার বদলায়, কিন্তু আমাদের এলাকার রাস্তার কোনো পরিবর্তন হয় না।
এম এম কলেজের দক্ষিণ গেট এলাকার মুদি দোকানি কামাল মিয়া বলেন, তার দোকান সড়কের পাশে হওয়ায় ভোগান্তি আরও বেশি। বছরের ছয় থেকে সাত মাস সড়কে পানি জমে থাকে। বর্ষায় পানি আর শীতে ধুলার কারণে ব্যবসা করা ও চলাচল—দুটিই কঠিন হয়ে পড়ে।
শংকরপুর বাস টার্মিনাল ও চাঁচড়া বাজার এলাকায় সড়কের কার্পেটিং উঠে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির সময় গর্তগুলো পানিতে ডুবে থাকে গভীরতা বোঝা যায় না। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। রিকশাচালক সেলিম বলেন, প্রায় এক বছর ধরে সড়কটির অবস্থা খারাপ। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়; মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনাও ঘটে।
ইজিবাইকচালক মানিকের ভাষ্য, দেড় বছর ধরে পাড়া-মহল্লার সড়কগুলোর অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়েছে। বেজপাড়া নলডাঙ্গা নতুন বাজার সড়কের ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষ চলাচল করলেও দীর্ঘদিন সংস্কার হয়নি। ফলে ছোটখাটো দুর্ঘটনা লেগেই আছে। শিশুদের জন্য সড়কটি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
শংকরপুরের বাসিন্দা সাকিলা আফরোজ বলেন, বৃষ্টির সময় এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পানি নামতে তিন থেকে চার দিন লেগে যায়। এ সময় ভাঙা সড়কে চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে ওঠে। একই অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা খোকন শেখ, মোহাম্মদ সেলি ও মিজানুর রহমানের।
খড়কী শাহ আবদুল করিম সড়কের বাসিন্দা মোস্তফা কামাল বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুসমান পানি জমে সড়ক ডুবে যায়। তখন ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
নীলগঞ্জ তাঁতিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, সড়কে বড় বড় গর্ত তৈরি হলেও সংস্কারের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। রেলস্টেশন এলাকার বাসিন্দা জাহিদ হোসেন টগরের অভিযোগ, আগের মেয়রদের আমলে সড়ক সংস্কারে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
চাঁচড়া রায়পাড়ার বাসিন্দা শিকদার মোহাম্মদ রনি বলেন, বৃষ্টিতে ভাঙা সড়ক মরণফাঁদে পরিণত হয়, অথচ পৌর কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।
এ বিষয়ে পৌরসভার প্রশাসক ও ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত মেরামতকাজ শুরু করা হবে।
