খুলনা অফিস :
মায়ের সামনে মেয়েকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা, ছেলের পর প্রবীণ বাবাকে খুন, একের পর এক গুলিবর্ষণ, অপহরণ ও বেপরোয়া চাঁদাবাজি-সব মিলিয়ে খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও রক্ষা পাচ্ছেন না অপরাধীদের থাবা থেকে; দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন খোদ পুলিশ পরিদর্শক। অপরাধীদের বেপরোয়া চক্র, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং পুলিশের কার্যকারিতা নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে পুরো খুলনায় এখন গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পাঁচ দিনে দুই খুন ও ছয়জন গুলিবিদ্ধ
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে খুলনায় গুলিতে নিহত হয়েছেন দুজন এবং গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অন্তত ছয়জন। গত ২৪ অক্টোবর পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) খুলনা সফরের দিনও রক্তপাত এড়ানো যায়নি। ওই দিন সকালে তেরখাদায় যুবদল নেতা রামিম বিশ্বাস, সন্ধ্যায় টুটপাড়ায় মুদি দোকানি আকাশ কুমার কুণ্ডু গুলিবিদ্ধ হন এবং রাতে বাবুখান রোডের একটি ক্লিনিকে মুখােশধারীরা হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে গুলিবর্ষণ করে।
এর আগে ২২ অক্টোবর ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে তাওহিদুল ইসলাম তুষার ও লবণচরার জিন্নাহপাড়ায় দুই সন্তানের জননী খুশি আক্তার নিহত হন। খুশি আক্তারকে তার মায়ের চোখের সামনে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এর আগে রূপসায় আক্তার ঢালী নামের এক বৃদ্ধকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যার ছেলেকে মাত্র দেড় মাস আগে একইভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছিল সন্ত্রাসীরা।
রক্তক্ষয়ী পরিসংখ্যানে থমকে দাঁড়িয়েছে নগরী
খুলনা মহানগর পুলিশ (কেএমপি) ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্যচিত্র অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। কেএমপির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে মহানগরীতেই ৩৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। জেলা ও মহানগর মিলিয়ে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১-এ। আর বিগত ৩৩ মাসে মহানগর এলাকায় মোট ৯৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, মূলতঃ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের কারবার, পরিবহন-ঘাট-ঠিকাদারি দখল এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করেই নগরীতে অপরাধের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সক্রিয় অন্তত ৯টি সন্ত্রাসী গ্যাং
খুলনায় বর্তমানে অন্তত ৯টি চিহ্নিত অপরাধী গ্রুপ তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে
বি-কোম্পানি: সাবেক মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমানের গাড়িতে গ্রেনেড হামলায় অভিযুক্ত বিদেশ অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এটি। তার বিরুদ্ধে ১৭টির বেশি মামলা রয়েছে।
পলাশ গ্রুপ: সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শেখ পলাশের নেতৃত্বাধীন চক্র। যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর তিনি গ্রেপ্তার হলেও তার সহযোগীরা এখনো সক্রিয়।
অন্যান্য সক্রিয় বাহিনী: টুটপাড়া-মহিরবাড়ি এলাকায় নূর আজিম গ্রুপ, চানমারী-শিপইয়ার্ডে আশিক বাহিনী, লবণচরায় শাকিল গ্রুপ এবং দৌলতপুর-দেয়ানা এলাকায় হুমা বাহিনী, আরমান গ্রুপ ও কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক নেতা নাসিমুল গনির নাসিম গ্রুপ।
নগর পুলিশের ধারণা, একসময় খুলনায় ২০০টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এদের বড় একটি অংশ এসব পেশাদার সন্ত্রাসী গ্রুপে যুক্ত হয়ে আরও মারাত্মক অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন ও বিকল্প শাসন
অপরাধী গ্রুপগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার বানিয়েছে। ফেসবুকে অস্ত্রসহ ছবি ও হুমকির ভিডিও ছেড়ে ভয়ভীতি ছড়ানো হচ্ছে। ‘বি-কোম্পানি’ নামক পেজ থেকে ঘাটের টোল মওকুফ কিংবা নিজস্ব আদালতে বিচারের কথা ঘোষণা করে বিকল্প কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এ ছাড়া, ব্যবসায়ীদের কাছে কোটি কোটি টাকার চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। হার্ট অ্যান্ড হেলথ কেয়ার নামক একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়ায় সেটি দেড় মাস বন্ধ রাখতে বাধ্য হন মালিকপক্ষ। সদর সাব-রেজিস্ট্রারকে প্রকাশ্যে অপহরণের মতো ঘটনা ঘটলেও ভয়ে কেউ মামলা করতে সাহস পাচ্ছেন না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থবিরতা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ভুক্তভোগীরা মামলা না করা, জামিনে অপরাধীদের দ্রুত বেরিয়ে আসা এবং তথ্য না দেয়ায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। তবে নাগরিক সমাজ ও বিশেষজ্ঞরা এ যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা জানান, গত অভ্যুত্থানের পর পুলিশ এখনো মানসিক স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি এবং কাজেও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষকরা অপরাধীদের পেছনের মদদদাতা ও অর্থের উৎস বন্ধ করার পাশাপাশি সাক্ষীদের সুরক্ষার তাগিদ দিয়েছেন।
এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, পুলিশ সদস্যরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা না মেনে বা ভয়ে-স্বার্থের কারণে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আপস করছেন, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে খুলনাজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্পেশাল অপারেশন চালানোর কথা বললেও বাস্তবে অপরাধীদের তৎপরতা না কমায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে।
