খান নাজমুল হুসাইন :
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে সাংবাদিক মো. ইব্রাহিম খলিল ও তাঁর পরিবারের সদস্যসহ চারজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা চাঁদাবাজি, মারপিট, ভাঙচুর ও মাছ লুটের মামলায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ‘কাঙ্ক্ষিত উৎকোচ’ না পেয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের সঙ্গে মামলার নথি, আসামিদের শারীরিক সক্ষমতা, ঘটনার সময় তাদের অবস্থান এবং চার্জশিটের কিছু তথ্যের অসঙ্গতিও সামনে এসেছে।
মামলায় ৩ নম্বর আসামি করা হয়েছে প্রায় ৭৯ বছর বয়সী আব্দুল কাদেরকে। পরিবারের দাবি, ২০১৪ সালে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর ডান হাত ও ডান পা দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইজড। বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর দৃষ্টিশক্তিও কমে গেছে। শ্যামনগর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে তাঁর চোখের অস্ত্রোপচার করে লেন্সও বসানো হয়েছে। এমন শারীরিকভাবে অক্ষম একজন বৃদ্ধের বিরুদ্ধে হামলা, চাঁদাবাজি ও লুটপাটে অংশ নেওয়ার অভিযোগ এনে চার্জশিট দেওয়ায় তদন্তের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আসামিপক্ষ ও স্থানীয়রা।
মামলার সূত্রপাত যেভাবে:
মামলার নথি অনুযায়ী, কালিগঞ্জ উপজেলার গণেশপুর গ্রামের রুহুল আমিন শেখ ২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের পরানপুর এলাকায় তাঁর ১৬ বিঘা মৎস্য ঘেরে হামলা, ভাঙচুর, চাঁদাবাজি ও মাছ লুটের অভিযোগে সাংবাদিক মো. ইব্রাহিম খলিলসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে ঘটনার তারিখ ২ জানুয়ারি ২০২৬ এবং সময় সকাল ১১টা উল্লেখ করা হয়।
পরে আদালতের নির্দেশে মামলাটি প্রথমে সিআর-১৯/২০২৬ এবং পরবর্তীতে জিআর-৩১/২০২৬ হিসেবে নথিভুক্ত হয়। প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান এসআই মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম। তিনি তদন্তকালে অন্তত একজন সাক্ষীর বক্তব্যও রেকর্ড করেন। পরবর্তীতে তাঁর আশাশুনি থানায় বদলি হলে মামলাটির পুনঃতদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় শ্যামনগর থানার এসআই মো. জহিরুল ইসলামকে।
‘৫০ হাজার টাকা দাবি’—তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ: সাংবাদিক ইব্রাহিম খলিলের অভিযোগ, পুনঃতদন্ত কর্মকর্তা এসআই জহিরুল ইসলাম মামলায় ‘ফাইনাল’ দেওয়ার জন্য তাঁর বড় ভাই সাইফুল ইসলামের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তদন্তের গতি পরিবর্তন হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। সাংবাদিক ইব্রাহিম খলিল বলেন, “মামলার ঘটনা মিথ্যা জানার পরও কাঙ্ক্ষিত টাকা না পাওয়ায় আমার ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। আমি আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছি।” সাগর হোসেন নামে এক ব্যক্তি দাবি করেছেন, তাঁর উপস্থিতিতেই তদন্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলামের কাছে মামলায় ‘ফাইনাল’ দেওয়ার কথা বলে টাকা দাবি করেছিলেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তদন্তের গতিপথ পরিবর্তন হয় বলেও দাবি তাঁর।
নাজমুল হুসাইন নামে আরেক সাংবাদিকের দাবি, এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা জহিরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর কথাও হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তা মামলার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন থাকার কথা জানালেও ইব্রাহিম খলিলকে ‘খরচ-খরচা’ দিতে বলেছিলেন এবং টাকা না দিলে তাঁর হাতে থাকা তথ্যের ভিত্তিতেই আদালতে চার্জশিট দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে উৎকোচ দাবির এসব অভিযোগ অস্বীকার বা স্বীকার না করে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জহিরুল ইসলাম বলেন, “আমার যা দেওয়ার আমি দিয়েছি, আমার হাতে কিছু নেই। আমি আদালতে চার্জশিট দিয়েছি, আসামিপক্ষ আদালতে প্রমাণ করুক তারা নির্দোষ।” উৎকোচ হিসেবে ৫০ হাজার টাকা দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পাল্টা বলেন, “লোকাল সাংবাদিকরা চাঁদাবাজি করে আমি জানি”— এরপরই ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। চার্জশিটে গুরুতর অভিযোগ, আসামিদের দাবি—‘সবই সাজানো’ ৮ জুলাই ২০২৬ আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩৮৫, ৩৮৬, ৪২৭, ৩৭৯, ৫০৬ ও ১১৪ ধারার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১৪৩, ৩৪১, ৩০৭ ও ৩৮৭ ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চার্জশিটে বলা হয়েছে, আসামিরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাদীর ১৬ বিঘা মৎস্য ঘেরে প্রবেশ করে ভেড়ি কেটে ক্ষতি করেন, এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন, ২০ হাজার টাকা জোরপূর্বক নিয়ে নেন এবং প্রায় তিন মণ বাগদা চিংড়ি নিয়ে যান। এতে আনুমানিক ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের দাবি, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও পূর্ববিরোধের জের ধরে সাজানো। তাঁদের ভাষ্য, জমি ও মৎস্য ঘের সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক ইব্রাহিম খলিল ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করতেই মামলাটি করা হয়েছে।
ঘটনার দিন ইব্রাহিম খলিল ছিলেন ঝিনাইদহে—দাবি আসামিপক্ষের
আসামিপক্ষের দাবি, মামলায় ২ জানুয়ারি ২০২৬ সকাল ১১টায় ঘটনাটি ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হলেও ওই সময় সাংবাদিক ইব্রাহিম খলিল সাতক্ষীরায় ছিলেন না। তথ্য সংগ্রহের কাজে তিনি ঝিনাইদহে অবস্থান করছিলেন।
তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ঝিনাইদহের আরাপপুর ক্যাডেট কলেজ রোড এলাকার রাবেয়া হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। ১ জানুয়ারি সকাল ১০টায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ৫ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় ছাড়পত্র নেন বলে দাবি করা হয়েছে।
আসামিপক্ষের বক্তব্য, ঘটনার সময় তিনি যদি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকেন, তাহলে মামলায় বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্তে যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। প্যারালাইজড বৃদ্ধের বিরুদ্ধে ‘হামলা-চাঁদাবাজি’—
স্থানীয়দের প্রশ্ন:
শ্যামনগরের পরানপুর গ্রামের মৎস্য ঘের ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ, বাবু মোড়ল, হেমায়েত ও রেজাউল করিমসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেছেন, মামলায় বর্ণিত চাঁদাবাজি, লুটপাট বা মারপিটের ঘটনা তাঁরা এলাকায় ঘটতে দেখেননি এবং তাঁদের জানা মতে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।
তাঁদের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে ডান হাত-পা প্যারালাইজড থাকা একজন বৃদ্ধ কীভাবে মামলায় বর্ণিতভাবে হামলা ও চাঁদাবাজিতে অংশ নিলেন? তাঁদের দাবি, আব্দুল কাদেরের বাড়ি থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব আনুমানিক ১৭-১৮ কিলোমিটার। তাছাড়া মৎস্য ঘেরের ভেড়ি সরু হওয়ায় তাঁর মতো চলাচলে অক্ষম একজন ব্যক্তির সেখানে যাওয়া এবং কথিত হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তে শারীরিক বাস্তবতার আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন ছিল।
চার্জশিটের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন:
আসামিপক্ষ চার্জশিটে ২ নম্বর আসামি আনিছুর রহমানের মায়ের নাম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। চার্জশিটে তাঁর মায়ের নাম ‘মনোয়ারা বেগম’ উল্লেখ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকৃত নাম ‘আসুরা বিবি’।
আসামিপক্ষের প্রশ্ন—একজন আসামির পারিবারিক পরিচয় পর্যন্ত যদি সঠিকভাবে যাচাই না করা হয়ে থাকে, তাহলে মামলার ঘটনাস্থল, সাক্ষী, আলামত, শারীরিক সক্ষমতা ও ঘটনার সময় আসামিদের অবস্থান কতটা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হয়েছে?
দুই আসামির জামিন মঞ্জুর:
মামলার ৩ নম্বর আসামি আব্দুল কাদের ও ৪ নম্বর আসামি জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে গত ১ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা শ্যামনগর থানা আমলী আদালত-৫-এ জামিন আবেদন করা হয়। সিনিয়র আইনজীবী মো. আব্দুল মজিদের শুনানি শেষে আদালত দুই আসামির জামিন মঞ্জুর করেন।
বাদীর বক্তব্যেও উঠে এসেছে পূর্ববিরোধের কথা: মামলার বাদী রুহুল আমিন শেখের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ২ নম্বর আসামি আনিছুর রহমানের কাছে তিনি জমির হারি বাবদ টাকা পান। টাকা আদায়ের জন্য কৈখালী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালামের কাছে এবং জামায়াতের পার্টি অফিসে বিচার দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি জানান। সেখানে সমাধান না হওয়ায় মামলা করেছেন বলে দাবি তাঁর। ইব্রাহিম খলিল কেন মামলায় আসামি—এমন প্রশ্নের জবাবে রুহুল আমিন শেখ বলেন, “সাংবাদিক ইব্রাহিম খলিল আনিছুর রহমানের ভাই। বিচারে ইব্রাহিম খলিল, আব্দুল কাদেরসহ সবাই উপস্থিত ছিল। তাই সবার নামে মামলা দিয়েছি।”
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি:
এদিকে মামলাটি ঘিরে স্থানীয় সাংবাদিক, আইনজীবী ও সচেতন মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাঁদের মতে, কোনো ফৌজদারি মামলায় তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উৎকোচ দাবি, পক্ষপাতিত্ব কিংবা অসম্পূর্ণ তদন্তের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে মামলার ঘটনার সময় সাংবাদিক ইব্রাহিম খলিলের অবস্থান, তাঁর চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি, বৃদ্ধ আব্দুল কাদেরের শারীরিক সক্ষমতা, ঘটনাস্থলের দূরত্ব, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, চার্জশিটের তথ্যগত অসঙ্গতি এবং প্রথম তদন্ত কর্মকর্তার তদন্তের ফলাফল—এসব বিষয় পুনরায় যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
তাঁদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি থেকে রক্ষা করা এবং তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার যথাযথ আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
সাংবাদিক মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, তিনি আদালতের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন এবং মামলার নথি, চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও অন্যান্য তথ্য বিবেচনায় নিয়ে ন্যায়বিচার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য বিজ্ঞ আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
অন্যদিকে, শ্যামনগর থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ সাফিউল ইসলাম পাটোয়ারীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
