বাংলার ভোর প্রতিবেদক
যশোর সদর উপজেলার বারীনগর সাতমাইল বাজারে ‘বারীনগর ডেন্টালে’ দন্ত চিকিৎসার নামে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। এখানে ডিগ্রি ছাড়াই শাহ আলম (বাবুল) ও শাহারুল হাসান চিকিৎসক পরিচয়ে নিয়মিত রোগী দেখছেন। তারা ‘চাচা-ভাতিজা’ মিলে এক প্রেসক্রিপশন প্যাড ব্যবহার করছেন। ব্যবস্থাপত্রে ওষুধ লেখা ছাড়াও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নির্দেশনা দিচ্ছেন তারা। এ জন্য প্রতি রোগীর কাছ থেকে তারা ১০০ টাকা করে ভিজিট নেন।
বারীনগর ডেন্টালের সামনে ঝুলানো সাইনবোর্ডে শাহ আলম (বাবুল) নামের শেষে ডিগ্রি লিখেছেন সিআইডিটি (ডিএমএমটিসি)। আরেকজন শাহারুল হাসান ডিগ্রি উল্লেখ করেছেন ডিএমটি ডেন্টাল (ডিএমএমটিসি), এফটি (যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, যশোর)। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃতপক্ষে এসব কোনো চিকিৎসকের ডিগ্রি নয়। তারা রোগীদের ফাঁদে ফেলার জন্য নামের শেষে ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহার করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাহ আলমের (বাবুল) নামে পরে লেখা ‘আইডিটি’ পূর্ণ শব্দ হলো ‘সার্টিফিকেট অ্যান্ড ডেন্টাল’। যেটা ৬ মাসের একটা কোর্স। ২০০১ সালে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য এই কোর্স চালু করা হয়েছিল। পরে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় ২০১০ সালে কোর্সটি বাতিল করে সরকার।
শাহারুল ইসলামের নামে পরে লেখা ‘ডিএমটি ডেন্টাল’ হলো তিন বছরের একটি কোর্স। ডেন্টাল সার্জনের সহকারি হিসেবে কাজ করার জন্য কোর্সটি সম্পন্ন করতে হয়। এ ছাড়া ‘এফটি’ কোনো চিকিৎসকের ডিগ্রি নয়। এটাকে ফিল্ড ট্রেনিং বলা হয়। অথচ রোগীদের আকৃষ্ট করার জন্য এফটির পরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের নাম লেখা হয়েছে। যাতে করে গ্রামের সাধারণ রোগীকে তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ দন্ত চিকিৎসক মনে করেন।
ব্যবস্থাপত্রে তারা চাচা-ভাতিজা (শাহ আলম বাবলু ও শাহারুল ইসলাম) নামের পরে ‘দন্ত চিকিৎসক’ লিখেছেন দাঁতের ব্যথা, দাঁত তোলা, স্কেলিং, ফিলিং (লাইট কিউরসহ), দাঁত বাঁধানো, বাকা দাঁত সোজা করা, রুট ক্যানেলসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার নামে প্রতারণা করছেন। একই সঙ্গে রোগীদের এক্স-রেসহ নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশনা দিচ্ছেন।
বারীনগর ডেন্টাল কেয়ারে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের চিকিৎসায় চাচা-ভাতিজা একটি প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করছেন। চিকিৎসক না হয়েও এক রোগীর দাতে রুট ক্যানেল করছেন শাহারুল ইসলাম।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুইজন রোগী জানান, দাঁতের সমস্যা নিয়ে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে বারীনগর ডেন্টাল কেয়ারে তাদের যাতায়াত। কিন্তু সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। কয়েকবার চিকিৎসা নিয়েছেন, কিন্তু তাতে কোনো উপকার হয়নি।
চেম্বারের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, দন্ত চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন মেশিনারিজ রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) স্বীকৃত কোনো ডিগ্রি ছাড়াই শাহ আলম (বাবুল) ও শাহারুল হাসান রোগীদের চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা দিচ্ছেন। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা এবং বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তারা ওই চেম্বারে রোগী দেখেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে শাহ আলম (বাবুল) বলেন, ২০০১ সালে তিনি একটি যশোরের একটি বেসরকারি ট্রেনিং সেন্টার থেকে ৬ মাসের ট্রেনিং ও ৬ মাসের ইন্টার্ন করেছেন। তখনকার সময় ‘আইডিটি’ ট্রেনিংয়ের অনুমোদন ছিল। তবে এটা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ডিগ্রি নয় বলে তিনি জানান।
শাহারুল হাসান জানান, তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ৩ বছরের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে সাবেক ডেন্টাল সার্জন ডা. কাজী শামীম আহমেদের কাছে ১ বছরের ইন্টার্ন করেন। তবে তিনি চিকিৎসক না, এটা অকপটে স্বীকার করেন। রোগীর ব্যবস্থাপত্র অস্ত্রোপচার করার ব্যাপারে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি।
শাহারুল হাসান আরও জানান, শাহ আলম (বাবলু) তার বড় চাচা। চাচাকে সম্মান করে আলাদা ব্যবস্থাপত্র প্যাড তৈরি করেননি। ‘চাচা ভাতিজি’ মিলে এক প্যাড ব্যবহার করেন। এক প্রেসক্রিপশন প্যাড দুজন ব্যবহার করা যাবে না, এটা তার জানা নেই।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা জানান, এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রিধারী এবং বিএমডিসি নিবন্ধনপ্রাপ্ত চিকিৎসক ছাড়া কেউ নামের আগে বা পরে ‘ডাক্তার’ লিখতে পারবেন না। বারীনগর ডেন্টাল কেয়ারে শাহ আলম (বাবুল) ও শাহারুল হাসানের ডিগ্রি প্রতারণা জানা ছিল না। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

