বাংলার ভোর প্রতিবেদক
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত ২৯০ জনের মধ্যে ১০৬ জনই নিয়োগপত্র পাননি। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাদের বাদ দেয়া হয়েছে বলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার থেকে নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলেও তালিকায় নাম না থাকায় চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত এসব প্রার্থীর নিয়োগ এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছে। নিয়োগপত্র না পেয়ে শনিবার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জড়ো হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। সঙ্গে ছিলেন অভিভাবকেরাও।
চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও কেন ১০৬ জনকে নিয়োগ দেয়া হলো না, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন প্রার্থীরা। তাদের অভিযোগ, নিয়োগের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাদ দেয়ার বিষয়টি তাদের জানানো হয়নি। পুনরায় ভেরিফিকেশন করে নিয়োগের ব্যবস্থা করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সহকারী শিক্ষক নিয়োগে যশোরে ২৯০ জন চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। এর মধ্যে ১৮৪ জনকে নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে। বাকি ১০৬ জনকে ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়নি।
নিয়োগপত্র না পাওয়ায় মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘সরকারি চাকরি করার স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে যশোরে এসেছিলাম। আট বছর ধরে ছাত্রাবাসে থেকে পড়াশোনা করেছি। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষা দিয়েছি। ২০২৫ সালে সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর স্বপ্ন দেখতে শুরু করি, একজন আদর্শ শিক্ষক হবো।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ আট মাস নিয়োগপত্রের অপেক্ষায় ছিলাম। গত বৃহস্পতিবার নিয়োগপত্র দেয়া শুরু হলে তালিকায় নিজের নাম না পেয়ে জেলা অফিসে যোগাযোগ করি। তখন জানানো হয়, গোয়েন্দা ভেরিফিকেশন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আমাকে বাদ দেয়া হয়েছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশনে অযৌক্তিকভাবে আমাকে বাদ দেয়া হয়েছে।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাহফুজুর বলেন, ‘আমার চাকরি হওয়ায় মা-বাবা অনেক খুশি হয়েছিলেন। এলাকায় সবাই জানে আমার চাকরি হয়েছে। এখন যদি চাকরি না হয়, কোন মুখ নিয়ে বাড়ি যাব?’
একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেছেন হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর নিয়োগপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম। এখন ভেরিফিকেশনের কারণে নিয়োগ না পাওয়ায় আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা হতাশ হয়ে পড়েছি। খবরটি শোনার পর থেকে মা কান্না করছেন, বাবাও স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। আমাকে কেন বাদ দেয়া হয়েছে, সেটি স্পষ্টভাবে জানানো হোক।’
শনিবার সকাল থেকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস চত্বরে জড়ো হতে থাকেন নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীরা। সেখানে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সন্তোষজনক কোনো সাড়া না পেয়ে তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান। সেখানে ৮০ থেকে ৯০ জন প্রার্থী অবস্থান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন অভিভাবকেরাও।
প্রার্থীদের অভিযোগ, চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পর তারা ধরে নিয়েছিলেন চাকরি নিশ্চিত। এ কারণে অনেকে অন্য চাকরির আবেদন বা পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগও হাতছাড়া করেছেন। এখন প্রাথমিকের চাকরিও না হওয়ায় তারা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
সাদ্দাম হোসেন নামে এক প্রার্থী বলেন, ‘সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর আবার কীসের ভেরিফিকেশন? এটা প্রহসন। আমাদের সঙ্গে জুলুম করা হয়েছে। প্রাথমিকে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর গত আট মাস অন্য কোথাও আবেদন করিনি। এমনকি ডাক বিভাগে ভাইভার জন্য ডেকেছিল, সেখানেও যাইনি। ভেরিফিকেশনের বিষয়টি পুনরায় যাচাই করে আমাদের নিয়োগ দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।’
ছেলের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবস্থান করেন কৃষক আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘বিনা টাকায় চাকরি হওয়ায় গ্রামের মানুষও খুশি হয়েছিল। রাতে শুনলাম ছেলেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এ কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছি। ছেলের মা খাওয়াদাওয়া বাদ দিয়েছে। হওয়া চাকরি থেকে এভাবে বাদ দেয়া অবিচার। আমি আর আমার ছেলে কোনো দলের রাজনীতি করি না। তাহলে আমাদের অপরাধটা কী?’
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে, শনিবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি কর্মসূচিতে যোগ দিতে সেখানে যান যশোর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ সময় নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীরা তার পথ আটকে নিজেদের সমস্যার কথা জানান। পরে প্রতিমন্ত্রী তাদের কথা শোনেন। প্রার্থীদের তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা দ্রুতই আপনাদের সমস্যা সমাধান কিংবা বাদ দেয়ার কারণ জানাবেন।’
