বাংলার ভোর প্রতিবেদক
যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডে অবস্থিত ‘পপুলার মেডিকেল সার্ভিসেস অ্যান্ড হাসপাতাল’-এর বাহ্যিক পরিকাঠামো আকর্ষণীয় হলেও প্রতিষ্ঠানটির বৈধ পরিচালন সংক্রান্ত নথিপত্রে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য যেসব আইনি লাইসেন্স ও অনুমোদন আবশ্যক, তার বড় একটি অংশের ঘাটতি নিয়েই অবৈধভাবেই হাসপাতালটি পরিচালিত হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
হসপিটাল পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স, স্থানীয় পৌরসভা, সিটি করপোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, লিমিটেড কোম্পানি হলে রেজিষ্টার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিস ও সার্টিফিকেট অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি) থেকে নেম ক্লিয়ারেন্স ও সার্টিফিকেট অব ইনকরপোরেশন। টিন ও বিন সার্টিফিকেট, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিন) এবং ভ্যাট নিবন্ধনের জন্য ব্যবসায়িক পরিচিতি নাম্বার (বিন), পরিবেশগত ছাড়পত্র, বিশেষ করে বায়োমেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র (বাধ্যতামূলক)।
তবে এগুলির অধিকাংশই নেই পপুলার মেডিকেল সার্ভিসেস এন্ড হসপিটালের। সেই সাথে হাসপাতালের ভিতরে নিজস্ব ফার্মেসি পরিচালনার জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে প্রদত্ত ড্রাগ লাইসেন্স আবশ্যক। কর্মরত সকল ডাক্তারদের বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এবং নার্সদের বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের হালনাগাদ রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে।
অন্যান্য কাগজপত্র জমির দলিল বা ভাড়ার চুক্তিপত্র, ভবনের নকশা অনুমোদন এবং মালিকের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে। অথচ এসব কাগজ পত্রের বেশিরভাগই নেই পপুলার মেডিকেল সার্ভিস এন্ড হাসপাতালের।
তবে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে কোন কোন অনুমোদন নেই এবং কোনগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ-তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে হাসপাতালের কর্মরত অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগপত্র না থাকারও অভিযোগ উঠেছে। শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মীদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেয়ার বিধান রয়েছে। এর জন্য মালিক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে। শ্রম আইন ২০০৬ এর দ্বিতীয় অধ্যায়ে (৫ধারা) পরিস্কার বলা হয়েছে, নিয়োগপত্র এবং ছবিসহ পরিচয়পত্র দেয়া ছাড়া কাউকে চাকরিতে নিযুক্ত করা যাবে না। শ্রম বিধিমালা ২০১৫ অনুযায়ি নিয়োগপত্রে কর্মীর পদের নাম, বেতন, অন্যান্য আর্থিক সুবিধা, কর্মঘন্টা ও ছুটির নিয়মাবলি স্পস্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। নিয়োগপত্র না দিলে ভুক্তভোগি কর্মচারি বা শ্রম পরিদর্শক চাইলে শ্রম আদালতে মালিকের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা করতে পারেন। এত কিছুর পরও সংশ্লিষ্ট যথাযথ কতৃপক্ষ পপুলার মেডিকেল সার্ভিসেস এন্ড হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোন আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
নিয়ম লঙ্ঘনের বিষয়টি দৃশ্যমান হলেও স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেয়ার পেছনে স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ তুলছেন স্থানীয়রা। জানা গেছে, যশোরের সিভিল সার্জন ড. মাসুদ রানার স্ত্রী নুরুন্নাহার খানম-যিনি বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবশকারী (অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট) চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত-তিনি নিয়মিত অফিস সময় শেষে এই বেসরকারি হাসপাতালে সেবা দিয়ে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, এই ঘনিষ্ঠতার কারণেই জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ হাসপাতালটির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকছে।
তবে সিভিল সার্জন তার স্ত্রীর রোগী দেখার বিষয়টি স্বীকার করলেও তার সাথে হাসপাতালটিকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার কোন সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন।
পরিবেশ লাইসেন্স না থাকলে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতাউর রহমান জানান, আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার আগে আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ করবো। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
একটি বেসরকারি হাসপাতাল মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় এর অনুমোদন, চিকিৎসক-নার্সের নিবন্ধন, অবকাঠামোগত নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কর্মীদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই পপুলার মেডিকেল সার্ভিসেস অ্যান্ড হাসপাতালের সব ধরনের লাইসেন্স ও অনুমোদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি না, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করা জরুরি।
