মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মামুন
এক সময় মুসলিম সমাজে রাত মানেই ছিল কুরআন তিলাওয়াত, অশ্রুসিক্ত দোয়া, দীর্ঘ সিজদা, তাহাজ্জুদের নামাজ এবং আল্লাহ তাআলার সঙ্গে একান্ত কথোপকথনের সময়। রাত ছিল মুমিনের আত্মশুদ্ধির মুহূর্ত, গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ এবং রবের নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সময়।
কিন্তু এ যুগে যেন রাতের অর্থই বদলে গেছে। এখন অনেকের কাছে রাত মানেই মোবাইলের স্ক্রিন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, অন্তহীন ভিডিও, অর্থহীন গল্প, রিলস, বিনোদন কিংবা এমন সব গুনাহ, যা মানুষের চোখ এড়িয়ে গেলেও আল্লাহ তাআলার দৃষ্টি কখনো এড়ায় না।
এখন রাত অনেকের কাছে বিশ্রামের সময়ের চেয়েও বেশি গুনাহের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়ে পরিণত হয়েছে। দিনের কাজ শেষ করে মানুষ রাতকে ইবাদতের জন্য নয়; বরং গুনাহের জন্য বরাদ্দ রাখে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে ক্লান্তি লাগে না; অথচ দুই রাকাত তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়াতে গেলেই শরীর ভাার হয়ে যায়। দুনিয়ার বিনোদনের জন্য রাত জাগা সহজ, কিন্তু আখিরাতের জন্য কয়েক মিনিট সময় বের করাও যেন কঠিন হয়ে গেছে।
এক সময় মানুষ রাত জাগত কুরআনের সঙ্গে, আর আজ অনেকেই রাত জাগে মোবাইলের স্ক্রিনের সঙ্গে। এক সময় রাত ছিল রহমত লাভের সময়, আর আজ অনেকের কাছে তা গুনাহ জমা করার সময়ে পরিণত হয়েছে।
সেল ফোন, নাকি হেল ফোন?
আমরা বলি ‘নেট’। নেট অর্থ ‘জাল’। আর ফিতনাও এক ধরনের জাল। আমাদের শায়খ, মাহবুবুল উলামা হযরত মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী রহ. একটি হৃদয়স্পর্শী কথা বলতেন। তিনি বলতেন, এটি শুধু ইন্টারনেট নয়; বরং যেন এন্টার নেট-অর্থাৎ, জালে প্রবেশ করো। কারণ, এই জালে একবার আটকে গেলে সেখান থেকে বের হওয়া অনেকের জন্য খুবই কঠিন হয়ে যায়।
তিনি আরও বলতেন, এটি শুধু ‘সেল ফোন’ নয়; বরং অনেকের জন্য ‘হেল ফোন’। ‘হেল’ মানে জাহন্নাম। অর্থাৎ, এই ফোন যদি মানুষকে গুনাহ, অশ্লীলতা, সময়ের অপচয় এবং আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে নিয়ে যায়, তাহলে সেটিই তার জন্য জাহান্নামের পথে চলার একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
প্রিয় বন্ধু!
আজ আমরা এই জালে এমনভাবে আবদ্ধ হয়ে গেছি যে, কোথাও এক-দুই ঘণ্টার জন্য বসলেও প্রথমেই চোখ খুঁজতে থাকে-এখানে ওয়াই-ফাই আছে কি না। রাতের পর রাত কেটে যায় স্ক্রল করতে করতে। এক ভিডিও শেষ হয়, আরেকটি শুরু হয়। কিন্তু সেই রাতই হয়তো আমাদের জীবনের শেষ রাত হতে পারে-এই চিন্তা আমাদের মনে খুব কমই আসে।
আমরা প্রায়ই সন্তানদের নসীহত করি-বাবা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো। কিন্তু সে কি কখনো দেখেছে যে, আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সব কাজ ফেলে মসজিদের দিকে ছুটে গেছি?
আমরা বলি-বাবা, মোবাইল কম দেখো। কিন্তু আমাদের নিজের হাতেই কি সারাক্ষণ মোবাইল থাকে না?
আমরা বলি-মিথ্যা বলা মহাপাপ। কিন্তু নিজেদের প্রয়োজনে কি আমরা ছোট-বড় মিথ্যাকে সহজভাবে গ্রহণ করি না?
আমরা চাই সন্তান ভদ্র হোক, অথচ আমাদের মুখে রাগ, গালি ও কঠোর ভাষা। আমরা চাই সন্তান সত্যবাদী হোক, অথচ আমাদের কথার সঙ্গে কাজের মিল নেই।
মনে রাখতে হবে, সন্তান কেবল আমাদের উপদেশ শোনে না; সে আমাদের জীবন পড়ে। সে আমাদের প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি অভ্যাস এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত নীরবে শিখে নেয়। এ কারণেই বলা হয়, সন্তান হলো মা-বাবার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মূল ছবিতে যা থাকবে, প্রতিচ্ছবিতেও তাই ফুটে উঠবে।
প্রিয় পাঠক!
একটু নিজেকে প্রশ্ন করুন-
গত সাত রাতের মধ্যে কয়টি রাত এমন কেটেছে, যেখানে অন্তত কয়েক মিনিট আল্লাহ তাআলার সামনে দাঁড়িয়েছি?
শেষ কবে মানুষের অগোচরে, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য চোখের পানি ফেলেছি?
শেষ কবে নিজের গুনাহগুলোর কথা মনে করে তাওবা-ইস্তিগফার করেছি?
শেষ কবে মোবাইলের স্ক্রিন বন্ধ করে কুরআন খুলেছি?
শেষ কবে তাহাজ্জুদের জন্য ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করেছি?
যদি আজকের রাতই আমার জীবনের শেষ রাত হয়, তাহলে আমি কি আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত?
আমার হিসাবটা আমিই মিলিয়ে দেখি আমি কি জান্নাতি না জাহান্নামী?
আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।
উপরের সংবাদটির উপর ভিত্তি করে একটি ছবি তৈরি করে দাও

