খান নাজমুল হুসাইন
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে সরকারি সড়ক নির্মাণকাজকে ঘিরে ফসলি জমি ও মৎস্য ঘেরের ভূগর্ভ থেকে ড্রেজার মেশিন (বলগেট) দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। অনুমোদিত বালুমহাল থেকে বালু না কিনে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে ভূগর্ভস্থ বালু তুলে সড়কের বেড ভরাট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে একদিকে সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষিত হচ্ছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হচ্ছে ঠিকাদারি সংশ্লিষ্টদের-এমন অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কালিগঞ্জ উপজেলার ১১ নম্বর রতনপুর ইউনিয়নের রাজবাড়ি কাটুনিয়া মন্দির থেকে ইউনুস মিস্ত্রির বাড়ির অভিমুখে প্রায় দুই কিলোমিটার নতুন কার্পেটিং রাস্তা নির্মাণকাজে এভাবে বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে চলা এ কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘রফিকুল এন্ড ব্রাদার্স’র স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের দাবি, বালুমহাল থেকে বালু না কিনে আশাশুনি উপজেলার ঘোলা গ্রামের বাসিন্দা ফারুক হোসেনের ড্রেজার মেশিন (বলগেট) ব্যবহার করে ফসলি জমি ও মৎস্য ঘেরের ভূগর্ভস্থ থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এ জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ড্রেজার মালিকের ফুটপ্রতি ৬ টাকা চুক্তি হয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রের দাবি। প্রায় এক মাস ধরে এভাবে বালু উত্তোলন করে নতুন সড়কের বেড ভরাট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজটি দেখভাল করছেন রেজাউল ইসলাম (রেজা) বলে জানা গেছে। এলজিইডির কার্পেটিং সড়কের সাব-গ্রেড বা সাব-বেসে ব্যবহারের জন্য বালুর গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত উৎস থেকে বালু সংগ্রহের নিয়ম রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বালুর মান পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ল্যাব টেস্ট এবং অনুমোদিত উৎস নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় কর্তৃক ইজারাকৃত অনুমোদিত বালুমহাল থেকে বালু সংগ্রহের বিধান রয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, এসব নিয়ম অনুসরণ না করে যদি কৃষিজমি বা মৎস্য ঘেরের ভূগর্ভস্থ থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু তোলা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও পরিবেশগত নিরাপত্তা কোথায়?
‘লাভের অঙ্ক’ বাড়াতেই কি অবৈধ বালু?
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, অনুমোদিত বালুমহাল থেকে বালু কেনার পরিবর্তে ভূগর্ভস্থ থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন তুলনামূলকভাবে কম খরচের হওয়ায় অধিক মুনাফার আশায় এ পদ্ধতি বেছে নেয়া হয়েছে।
তবে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবৈধ অর্থ লেনদেন বা ভাগ-বাটোয়ারার যে অভিযোগ স্থানীয়দের কেউ কেউ করেছেন, তার স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, প্রভাবশালী একটি চক্র সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন করছে। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের কারণে বিষয়টি নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টরা অনীহা দেখাচ্ছেন।
ভূমিধস ও কৃষিজমি ক্ষতির আশঙ্কা
স্থানীয়দের আশঙ্কা, একই স্থান থেকে অতিরিক্ত পরিমাণে ভূগর্ভস্থ বালু উত্তোলন করা হলে মাটির নিচের স্তরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভূমিধস, জমি দেবে যাওয়া এবং আশপাশের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি কৃষিজমির মাটির গুণগত মান নষ্ট হলে ভবিষ্যতে কৃষিকাজও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, অপরিকল্পিত ও অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে স্থানীয় ভূ-প্রকৃতি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মৎস্য ঘের ও কৃষিজমির কাছাকাছি এলাকায় ব্যাপক হারে বালু উত্তোলন হলে মাটি ক্ষয় ও ভূমির স্থিতিশীলতা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এলজিইডি কালিগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, “ড্রেজার মেশিন (বলগেট) দিয়ে বালু উত্তোলন করার ব্যাপারে আমি জানি না।”
কাজটির তদারকির দায়িত্বে থাকা এসও মেহেদী হাসান বলেন, তিনি নতুন অফিসে যোগদান করেছেন। মৎস্য ঘের ও ফসলি জমি থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বালু উত্তোলনের বিষয়ে অবহিত নন। কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মিলন শাহা বলেন, “ফসলি জমির ভূগর্ভ থেকে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণভাবে অবৈধ।” তিনি আরও বলেন, জনস্বার্থে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘রফিকুল এন্ড ব্রাদার্স’র স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। এদিকে স্থানীয়দের দাবি, সরকারি প্রকল্পের কাজে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের নামে যেন কোনোভাবেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সুযোগ তৈরি না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক তদন্ত, অবৈধ উত্তোলন বন্ধ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

