হাবিবুর রহমান,নড়াইল সংবাদদাতা :
নড়াইলের কালিয়া উপজেলায় অবস্থিত বড়দিয়া বাজার ব্রিটিশ আমল থেকেই এই অঞ্চলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র। একসময় নদীপথই ছিল এই বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান যোগাযোগের মাধ্যম।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসতেন। বড়দিয়া ও এর কাছাকাছি মহাজন বাজারের খ্যাতি আশপাশের অন্তত ২০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এখানে ৩টি জেলার কয়েকশ মানুষ ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
এই বাজারে বিভিন্ন ব্যাংক, এনজিও এবং কালিয়া উপজেলার সবচেয়ে বড় খাদ্যগুদাম রয়েছে। বর্তমান ব্যবসা-বাণিজ্য ও কার্যক্রম নিত্যপ্রয়োজনীয় ও পাইকারি পণ্য হিসেবে এখানে চাল, ডাল, সার, রড-সিমেন্ট ও হার্ডওয়্যার সহ নানা পণ্যের পাইকারি ও খুচরা কেনাবেচা চলে।
এলাকার কৃষিপণ্য ও পানের মতো জিনিসপত্র বিক্রির জন্য কালিয়া উপজেলার বড়দিয়া বাজার বেশ পরিচিত। তবে এই বাজারের প্রধান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ নদীভাঙন, নবগঙ্গা ও মধুমতী নদীর ভাঙনে বাজারের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে বাজারের প্রায় ৪০০ জন ব্যবসায়ী নদীভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
কাঁচা বাজারের রাস্তার বেহাল দশা এবং সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা ও কাদার সৃষ্টির কারণে ক্রেতা-বিক্রেতাদের চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নদী ভাঙন থেকে ঘরবাড়ি, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে মানববন্ধন করেছেন নড়াইল লোহাগড়া উপজেলার এলাকাবাসী। মঙ্গলবার সকালে উপজেলার কোটাকোল ইউনিয়নের বড়দিয়া বাজার সংলগ্ন খেয়াঘাট এলাকায় মধুমতী নদীর পাড়ে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।ঘন্টাব্যাপী কর্মসূচিতে শতাধিক নারী পুরুষ অংশ নেন।
সেখানে বক্তব্য দেন কোটাকোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাচান আল মামুদ, খাশিয়াল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বি.এম. বরকত উল্লাহ, মোল্যা শাহাদাত হোসেন, জাহিদুর রহমান,সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, সুলতানা বেগম, রাবেয়া আক্তার, সবুজ খান,জাহিদুর রহমান কিসমত, মামুন খান প্রমুখ।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, শুধুমাত্র এক দিনের ব্যবধানে নদী পাড়ের ১০ থেকে ১৫ টি বসতঘর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নদী পাড়ে যে মানুষ গুলো বাস করেন তারা মুলত ছিন্নমূল মানুষ।নদী গর্ভে তাদের ঘর বাড়ি বিলীন হয়ে গেলে তারা যে আরেকটি ঘর নির্মাণ করে বসবাস করবেন এমন সামর্থ্য তাদের নেই। শুধু নদী পাড়ে বসবাসকারী নয়, বড়দিয়া বাজার একটি ঐতিহ্যবাহী বাজার। এখানে একটি বন্ধর ছিল।
বাজরটি নদী ভাঙনের ফলে আজ ছোট হয়ে গেছে। যে টুক আছে সেটুক ও আজ হুমকির মুখে। আজ দোকানঘর সহ শতশত বাড়ি ঘর হুমকির মুখে রয়েছে। বড়দয়া বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান,ইতোমধ্যে বাজারের কয়েকটি দোকান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে বাজারের ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উপায় না পেয়ে দোকান সরিয়ে নিচ্ছে ভুক্তভোগীরা। বাজারে কয়েকটি দোকান যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। এরই মধ্যে মালামালসহ দোকানের অবকাঠামো সরিয়ে নেওয়া শুরু করেছে ব্যাবসায়ীরা। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ থাকলে এ দুর্ঘটনায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতি হতো না।
নদী ভাঙনে বাড়িঘরসহ সর্বোচ্চ হারিয়ে মানববন্ধনে ব্যানার হাতে দাড়িয়ে ষাটোর্ধ নারী নিহাত বেগম কান্নাজড়িত কন্ঠে। আমি এক জন সর্বহারা। অনেক কষ্ট করে ঘরটুক দিছিলাম।নদীতে তা নিয়ে গেল! এহন আমার থাহারও কোন পরিবেশ নেই৷ আমারে এহন একটু তাহার ব্যবস্থা করে দিন।
বাড়ির জমি সব চলে গেছে। অল্প এট্টু আছে। ওইটুক ও থাকবে নানে। পানি টান দিলি সব নামে চলে যাবেনে। আমার কোন-হানে যাওয়ার জায়গা নাই। আমার কোন পথ নাই। সেই জায়গা যায়ে থাকব। খাশিয়াল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বি. এম. বরকত উল্লাহ বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে মধুমতি ও নবগঙ্গা নদীর সংযোগ স্থলে ভাঙ্গন সৃষ্টির ফলে বড়দিয়া মৌজাটাই অনেককাংশে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাজারের অধিকাংশ দোকান ঘর ভেঙে গেছে। বন্দর এখন আর নেই।
এসবের প্রধান কারন হল নদী ভাঙন। আজ নতুন করে ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়ে বড়দিয়া বাজার হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। তিনি বলেন, নড়াইল ১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের সাথে বড়দিয়া বাজারের ব্যবসায়ীদের সাথে নিয়ে এ বিষয়ে কথা বলেছি। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ভাঙন মোকাবেলায় নদী পাড়ে জিয়ো ব্যাগ ফেলানোর জন্য একটি প্রকল্প জমা দিয়েছেন।
ভবিষ্যৎ ব্লক ফেলে স্থায়ী বাধ নির্মাণ করে দিবেন। এখন পানি বাড়ছে। দুই দিন পর পানি টান দিবে, তখন ভাঙন আরোও বেড়ে যাবে। সেটি প্রতিহত করতে হলে অনতিবিলম্ব এখানে জিয়ো ব্যাগ ফেলাতে হবে। বড়দিয়া খেয়াঘাট থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত দ্রুত সময়ে জিয়ো ব্যাগ ফেলে নদী পাড়ের বাসিন্দা ও দোকান ঘর বাঁচাতে সংশ্লিষ্টের সুদৃষ্টি কামনা করছি।
কোটাকোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাচান আল মামুদ বলেন,”ব্রিটিশ আমলের বড়দিয়া বাজারটি খাশিয়াল ও কোটাকোল ইউনিয়নের মানুষের ব্যবসা বানিজ্যের একটি বাজার। এই বাজারটি এখন নদী ভাঙ্গনের জন্য ছোট হয়ে যাচ্ছে।
ব্যবসায়ী তাদের সর্বোচ্ছ হারাচ্ছে। আমরা দুই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নদী ভাঙনের বিষয়ে সংসদ সদস্য সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানিয়েছি৷ আশাকরি নদী ভাঙন রক্ষার সরকার পদক্ষেপে নেবেন। শুধু তাই নয় যে সব বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। যারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তাদের পূর্ণবাসন করা হক।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজীৎ কুমার সাহা জানান, নবগঙ্গা অত্যন্ত ভাঙনপ্রবণ নদী। এই নদীর ভাঙন প্রতিরোধে বিভিন্ন এলাকায় কাজ চলছে। এছাড়া স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। যা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রকল্পটি পাস হলে বড়দিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে আমরা কাজ করতে পারব। এছাড়া বর্ষা মওসুমে তাৎক্ষণিক ভাঙন প্রতিরোধে ঝুঁকি এলাকা বিবেচনায় আপদকালীন কাজের অংশ হিসেবে ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রস্তুতি রয়েছে। যার মাধ্যমে মানুষের বাড়িঘর ও মূল্যবান স্থাপনা রক্ষার চেষ্টা করা হচ্ছে।
