বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডে অবস্থিত ‘পপুলার মেডিকেল সার্ভিসেস অ্যান্ড হসপিটালের’ বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা, অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে এক দরিদ্র রোগীকে প্রতারিত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পপুলার হসপিটালের ডা. এস এম মনির হোসেন রেজার কাছে এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন চৌগাছা উপজেলার ফুলসরা ইউনিয়নের বলিদাপাড়া গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম (৫৫)। বারবার অপচিকিৎসা ও টালবাহানার শিকার হয়ে অবশেষে চরম শারীরিক ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন তিনি।
ভুক্তভোগী রবিউল ইসলাম ও তার স্বজনদের অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, কোমরে ব্যথাজনিত কারণে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে চৌগাছার এক চিকিৎসক এ,এ,এম, মুক্তাদির বিল্লাহর মাধ্যমে পপুলার মেডিকেল সার্ভিসেস অ্যান্ড হসপিটালে ডা. এস এম মনির হোসেন রেজার শরণাপন্ন হন রবিউল। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ডা. রেজা তাকে জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে অস্ত্রোপচার (অপারেশন) না করলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। অস্ত্রোপচার করলে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আশ্বাস দেয়া হয়।
পরবর্তীতে ৮০ হাজার টাকায় চুক্তি করে গত ৮ জানুয়ারি রবিউল ইসলামকে শহরের মুজিব সড়কস্থ পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন সেখানে ডা. রেজা তার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন এবং ৮ দিন পর ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠান। তবে বাড়িতে ফিরেও শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় এবং তীব্র ব্যথা অনুভব করায় তিনি পুনরায় পপুলারে ডা. রেজার কাছে আসেন। তখন ডা. রেজা তাকে এমআরআই করার পরামর্শ দেন। গত ৪ এপ্রিল অন্য একটি হাসপাতাল থেকে এমআরআই করিয়ে রিপোর্ট দেখালে ডা. রেজা স্বীকার করেন যে, আগের অস্ত্রোপচারটি অসম্পূর্ণ ছিল এবং পুনরায় অস্ত্রোপচার করতে হবে।
ভুক্তভোগীর পরিবার জানায়, ডা. রেজা নিজের খরচে পুনরায় সঠিক অস্ত্রোপচার করিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গত ১৬ জুন রবিউলকে খুলনা গাজী মেডিকেলে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশ নিতে পরদিন বিদেশে যাবেন-এমন অজুহাতে রোগীকে অন্য এক চিকিৎসকের কাছে হস্তান্তর করেন ডা. রেজা। তবে ওই চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র লিখে জানিয়ে দেন, বর্তমান অবস্থায় নতুন করে কোনো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন নেই, কেবল নিয়মিত ওষুধ খেলেই চলবে।
এ ঘটনার পরও শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) রবিউল ইসলাম পরিবারসহ পুনরায় পপুলার মেডিকেল সার্ভিসেস অ্যান্ড হসপিটালে ডা. রেজার চেম্বারে হাজির হন। ভুক্তভোগীদের দাবি, এবার ডা. রেজা আর চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং অন্য কোনো ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন দরিদ্র এই কৃষক। স্বজনদের সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়ে নিজের সুস্থতার আকুতি জানান তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, পরিস্থিতি ঘোলাটে দেখে ডা. রেজা পপুলার হাসপাতালের পরিচালক নজরুল ইসলাম ও আসিফুর রহমানসহ বেশ কয়েকজনকে ডেকে আনেন। তারা ভুক্তভোগী ও তাঁর পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়ে দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করার নির্দেশ দেন।
হাসপাতাল চত্বর থেকে বের হয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্বজনদের নিয়ে নিজের ওপর ঘটে যাওয়া প্রতারণার চিত্র তুলে ধরেন রবিউল ইসলাম। তিনি জানান, চুক্তি অনুযায়ী ৮০ হাজার টাকা ছাড়াও ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ডাক্তারের ফি বাবদ চিকিৎসার পেছনে তার প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। জমি-জমা বিক্রির টাকায় চিকিৎসা করাতে এসে এখন তিনি পুরোপুরি নিঃস্ব ও পঙ্গুপ্রায়।
রবিউলের স্বজন জাহিদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ডাক্তার রেজা নিজে ভুল চিকিৎসার কথা স্বীকার করে বিনামূল্যে পুনর্বার অস্ত্রোপচারের আশ্বাস দিয়ে রোগীকে খুলনায় নিয়ে গিয়েছিলেন। এখন তিনি টালবাহানা করে দায়িত্ব এড়াতে অন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে বলছেন। এভাবে চিকিৎসাসেবার নামে সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে নেয়া হচ্ছে, অথচ দেখার কেউ নেই।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক্তার এস এম মনির হোসেন রেজা টাকা নেয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর না দিয়ে জানান, এ মুহূর্তে কত টাকা নেয়া হয়েছিল তা তার মনে নেই। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, “রোগী বর্তমানে সুস্থ আছে।” এ কথা বলেই তিনি মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অন্যদিকে, এ বিষয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো ভূমিকা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। কোনো প্রকার অনুমোদন ও তদারকি ছাড়াই কীভাবে ক্লিনিকে এমন ভুল চিকিৎসা ও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে সে বিষয়ে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী।
