হাবিবুর রহমান, নড়াইল
তিন গ্রামের মানুষের বাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। পাঁচ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কে কাঁদা আর কাঁদা। মাঠের ফসলও ঘরে তুলতে কষ্টের শেষ নেই এ সব গ্রামের কৃষকদের। বর্ষাকালে সব ধরনের যান চলাচল একেবারেই বন্ধ। হঠাৎ করে কেউ অসুস্থ হয়ে গেলে হাসপাতালে আনতে গেলে তাদের জীবন অর্ধেক শেষ। সড়কটির এই অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে বছরের পর বছর তারা ছুটেছেন সরকারি দফতরে। কিন্তু কোন প্রতিকার মেলেনি।
গ্রামীণ সড়কটি নড়াইল সদর উপজেলার কলোড়া ইউনিয়নের নিরালী গ্রাম থেকে শেখহাটি ইউনিয়নের দেবভোগ অভিমুখি। নদীর কুলবর্তী দুই গ্রামের বাসিন্দাদের চলাচলের গ্রামীণ এ সড়ক নির্মাণের দাবি বহু আগের। কিন্তু বছরের পর বছর প্রতিশ্রুতি পেলেও রাস্তায় কোন উন্নয়ন ছোঁয়া লাগেনি।
শুধু দেবভোগ নিরালী নয়, মুলিয়া ইউনিয়নের পানতিতা নদীর কূল হয়ে আখুদা দেবভোগ, এগারোখান রাস্তাটিও কাঁচা রয়ে গেছে। কয়েকশত মানুষের বসবাস এ গ্রাম দুটিতে। কাঁচা রাস্তা হওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদফতরের (এলজিইডি) তথ্য মতে তাদের অধিনে থাকা ১ হাজার ৪ শত ৪৭ টি সড়ক, যার দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ২ শত ২৫ কিলোমিটার। গ্রামীণ এ সড়কের ৬০ শতাংশই কাঁচা। এর মধ্যে সদর উপজেলায় মোট সড়ক রয়েছে ১ হাজার ১ শত ৮১ কিলোমিটার যার মধ্যে কাঁচা সড়ক ৭শত ৩৮ কিলোমিটার। এ উপজেলায় কাঁচা সড়ক রয়েছে ৬২ শতাংশ।
এদিকে লোহাগড়া উপজেলায় মোট সড়ক রয়েছে ১ হাজার ১৯৯ কিলোমিটার যার মধ্যে কাঁচা ৭শত ৮৯ কিলোমিটার। এ উপজেলায় কাঁচা সড়ক রয়েছে ৬০ শতাংশ। কালিয়া উপজেলায় মোট সড়ক রয়েছে ৭৪৫ কিলোমিটার যার মধ্যে কাঁচা ৪৩৩ কিলোমিটার। কাঁচা সড়ক রয়েছে ৫৮ শতাংশ। এছাড়া এলজিইডিতে নতুন সড়ক তালিকা আইডিভুক্ত (গেজেট) করার জন্য ১ হাজার ১০০টি কাঁচা সড়কের তালিকা পাঠানো হয়েছে। যার দৈর্ঘ্য ৯৪৬ কিলোমিটার। আরও ২৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ২১৪টি কাঁচা সড়ক নতুন করে তালিকা ভূক্ত করার কার্যক্রম চলছে।
নিরালী গ্রামের সম্রাট বিশ্বাস বিশ্বাস বলেন, জন্মের পর থেকে কাঁচা রাস্তা দিয়ে চলাচল। সারাবছর ফসল আনা নেয়ায় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। শীতকালে রাস্তা দিয়ে চলাচল করা গেলেও বর্ষাকাল আসলে একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে যায়। গ্রামটির অধিকাংশ পরিবার পান পাতার উপর নির্ভরশীল। পান পাতা বিক্রি করে চলে আমাদের সংসার চলে। পানগুলো কোন যানবাহনে নিয়ে বাজারে যাব তা নেয়ার কোন সুযোগ নেই। মাথায় করে পান নিয়ে যেতে হয়। সড়কটি নির্মাণের জন্য রাজনৈতিক নেতাদের কাছে বারবার বলা হলেও প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই জোটেনি।
শেখহাটি ইউনিয়নের দেবভোগ গ্রামের বাবুল বিশ্বাস বলেন, বর্ষা এলেই কাদায় ডুবে যায় গ্রামের রাস্তা জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নেয়াও হয়ে পড়ে দুঃসাধ্য। স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদেরও প্রতিদিন কাদা মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়। দেবভোগ নিরালী ৬ কিলোমিটার রাস্তা পাকাকরণে একাধিক বার রাজনৈতিক নেতাদের বলা হয়েছে। ভোট আসলে প্রতিশ্রুতি ছাড়া কিছুই মেলে না। ভোটের পর তাদের আর মনে থাকে না। রাস্তাটি পাকাকরণে কয়েক দফা আবেদনও করা হয়েছে।
মুলিয়া ইউনিয়নের পানতিতা গ্রামের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী পপি রায় বলে, প্রতিদিন কাঁদা মাড়িয়ে স্কুলে যেতে হয়। দিনে দুই বেলা কাদা মাড়িয়ে স্কুলে যেতে অনেক কষ্ট হয়। অনেক সময় রাস্তা স্যাৎসেতে হয়ে যায়। পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।
শুধু এই দুইটি গ্রামের সড়ক না। জেলায় তিনটি উপজেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রামীণ সড়কগুলোর অধিকাংশ এখনও কাঁচা রয়ে গেছে। যার কারণে বর্ষা মৌসুমে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় ওই সব গ্রামের বাসিন্দাদের।
স্থানীয় সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার ইকরামুল কবীর বলেন, জেলায় ৬০ শতাংশ রাস্তা এখনও কাঁচা আছে। বর্তমান অর্থ বছরে কয়েকটি প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু রাস্তা সংস্কারের জন্য প্রক্রিয়াধীন আছে। কিছু রাস্তা টেন্ডারে আছে। নড়াইল জেলা অবকাঠামো উন্নয়ন ও বৃহত্তর যশোর জেলা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে এটি প্রক্রিয়াধীন আছে। এই প্রকল্পগুলো পাস হয়ে গেলে আগামী অর্থ বছরে কাঁচা এবং পাকা রাস্তা ৫০ শতাংশে আনতে পারব।

