বাংলার ভোর প্রতিবেদক :
মহাসড়কের পাশে ময়লার স্তুপ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে বর্জ্য। কোথাও দিনের পর দিন পড়ে থাকছে পচা-দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য। বেওয়ারিশ কুকুর ও গবাদিপশু টেনে-হিঁচড়ে সেই ময়লা ছড়িয়ে দিচ্ছে আশপাশের রাস্তায়। কোথাও আবার ডাস্টবিন না থাকায় সড়কের একাংশই পরিণত হয়েছে ময়লা ফেলার স্থানে। এমন দৃশ্য এখন নিত্যদিনের যশোর শহরে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, যশোর পৌর এলাকায় বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের বসবাস। প্রায় এক লাখ পরিবারের এই শহরে প্রতিদিন গড়ে ৮০ টন বর্জ্য জমা হয়। এসব বর্জ্য সংগ্রহে পৌর এলাকায় রয়েছে ৪০টি বড় ও ৫০০টি মাঝারি কন্টেইনার। অথচ প্রায় এক লাখ পরিবারের বিপরীতে গৃহস্থালি বর্জ্য রাখার ডাস্টবিন সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১০ হাজার পরিবারকে। অর্থাৎ প্রায় ৯০ হাজার পরিবার এখনো পৌরসভার সরাসরি বর্জ্য সংগ্রহ কাঠামোর বাইরে।
ফলে বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি, বাজার ও প্রধান সড়কের পাশে যত্রতত্র বর্জ্য জমছে। অনেক জায়গায় কন্টেইনার উপচে ময়লা সড়কে ছড়িয়ে পড়ছে। দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় এসব বর্জ্য পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। বৃষ্টির পানি ও বর্জ্য মিশে তৈরি হচ্ছে নোংরা তরল, যা ড্রেন ও সড়কে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে শুধু শহরের সৌন্দর্যই নষ্ট হচ্ছে না, পরিবেশের ভারসাম্যও পড়ছে হুমকিতে।
যশোর-নড়াইল মহাসড়কের শহরতলির ঝুমঝুমপুরে ২০১৯ সালের আগস্টে চালু হয় পৌরসভার বর্জ্য শোধনাগার। প্রতিদিন ৪০ টন বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা ধরে এটি নির্মাণ করা হলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ১০ টনের মতো বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন উৎপন্ন ৮০ টন বর্জ্যরে মধ্যে প্রায় ৭০ টনই অপরিশোধিত থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিশোধিত বর্জ্য দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে সেখান থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস ও বিষাক্ত উপাদান ছড়িয়ে পড়ে। বর্জ্য থেকে তৈরি দূষিত পানি মাটি ও পানির সঙ্গে মিশে পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি মশা-মাছি ও অন্যান্য বাহকের মাধ্যমে নানা রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান মোল্লা জানান, বর্জ্য পচে সৃষ্ট গ্যাস বাতাসে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ায়। বর্জ্য মিশ্রিত পানি বিভিন্নভাবে মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে। মাটিতে মিশে যাওয়া বিষাক্ত উপাদান খাদ্যশৃঙ্খলেও ঢুকে পড়ে। মশা-মাছির মাধ্যমে ডায়রিয়া ও খাদ্যবাহিত রোগের জীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকিও রয়েছে।
তার মতে, এ সংকট মোকাবিলায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পুরো প্রক্রিয়াকে নতুন করে সাজাতে হবে। বর্জ্য উৎপাদনের স্থান থেকেই পচনশীল, অপচনশীল, প্লাস্টিক, কাচ ও কাগজ আলাদা করার ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর পৃথকভাবে এসব বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিংয়ের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় বর্জ্যরে স্তুপ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে নাগরিকদের মধ্যে। পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের পালবাড়ি থেকে আরবপুর মহাসড়কে ময়লার স্তুপ। স্থানীয় স্কুলের এক শিক্ষিকা শ্যামলী দাস বলেন, ভোরের মধ্যে ডাস্টবিন পরিস্কার করার কথা থাকলেও অনেক সময় ময়লার স্তুপ দুপুর পর্যন্ত পড়ে থাকে। কখনো কখনো কয়েক দিনও পরিস্কার করা হয় না। এতে দুর্গন্ধের পাশাপাশি রোগজীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পিস স্কুলে কর্মরত সাইফুল বলেন, শহরের অনেক এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় ডাস্টবিন কম। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলছেন। আবার বিদ্যমান ডাস্টবিনগুলোও নিয়মিত পরিস্কার না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
আনিসুর রহমান নামে একপথচারি বলেন, শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে পরিকল্পিতভাবে ডাস্টবিন স্থাপন এবং নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ করা হলে এ দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
যশোর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শরিফ হাসান বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সুবিধা না থাকা বড় সংকট। তার উপরে বৃষ্টিতে সব ভিজে গেছে। দ্রুত সব অপসারণ করা হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান জানান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মূলত পৌরসভার দায়িত্ব। তবে সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থাপনাটি আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।
পরিবেশবিদদের মতে, শুধু ডাস্টবিন বাড়িয়ে বা নিয়মিত ময়লা অপসারণ করে যশোরের বর্জ্য সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন উৎসস্থলেই বর্জ্য পৃথকীকরণ, আলাদা সংগ্রহ ব্যবস্থা, আধুনিক রিসাইক্লিং, পর্যাপ্ত শোধনক্ষমতা এবং কঠোরভাবে নিয়ম প্রয়োগ।
একদিকে প্রতিদিনের বিপুল বর্জ্যরে চাপ, অন্যদিকে অপর্যাপ্ত সংগ্রহ ও শোধন ব্যবস্থা-এই দুইয়ের চাপে যশোর শহরের পরিবেশ ক্রমেই বিপন্ন হয়ে উঠছে। দ্রুত সমন্বিত ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা না গেলে শহরের নান্দনিকতার পাশাপাশি সাড়ে চার লাখ মানুষের স্বাস্থ্যও আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

