কাজী নূর :
কমতে শুরু করেছে বাতাসের আর্দ্রতা। ভোরের আকাশে কোথাও কোথাও দেখা মিলছে হালকা কুয়াশার। শীতের এমন আগমনী বার্তার সঙ্গে যশোরের নিত্যপণ্যের বাজারেও বইতে শুরু করেছে স্বস্তির বাতাস। বাজারে বাড়তে শুরু করেছে শীতকালীন সবজির সরবরাহ। ফলে অধিকাংশ সবজির দাম কমেছে। পাশাপাশি ডিম, মুরগি ও বিভিন্ন ধরনের মাছের দামেও নিম্নমুখি প্রবণতা দেখা গেছে। অন্যদিকে চাল, ডাল, ভোজ্য তেলসহ অধিকাংশ মুদিপণ্যের দাম রয়েছে প্রায় স্থিতিশীল।
শুক্রবার যশোরের বড়বাজার ও চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
বাজারে বর্তমানে মানভেদে ফুলকপি প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বাঁধাকপি ৩০ থেকে ৫০ টাকা, শিম ৬০ থেকে ৭০ টাকা, পালংশাক ৪০ থেকে ৫০ টাকা, মুলা ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, বেগুন ৫০ থেকে ৭০ টাকা, টমেটো ৮০ থেকে ১০০ টাকা, গাজর ১২০ টাকা, কাঁচামরিচ ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ঝিঙে ৪০ থেকে ৫০ টাকা, পটল ৩০ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কাঁচকলা ৩০ থেকে ৪০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, পেঁপে ২০ টাকা এবং লাউ আকারভেদে ২০ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের শাক ২০ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।
সবজির সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গত কয়েক দিনে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যশোর শহরের বাজারে সবজির সরবরাহ কয়েক গুণ বেড়েছে। শীত যত এগিয়ে আসবে সরবরাহ তত বাড়বে। এতে দাম আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দাম নির্ভর করবে সরবরাহ ও চাহিদার ওপর।
শহরের ওয়াপদা এলাকার বাসিন্দা এনজিও কর্মী আগাস্টিনা নিকোলাস বিশ্বাস বলেন, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম কিছুটা কমলেও বোতলজাত এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ছে। ফলে একদিকে সাশ্রয় হলেও অন্যদিকে সংসারের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তাই সবজির দাম কমার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।
ডিম-মুরগিতেও স্বস্তি
ডিমের বাজারেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। বর্তমানে লাল ডিম প্রতি হালি ৩৮ থেকে ৪২ টাকা, সাদা ডিম ৩৮ টাকা, হাঁসের ডিম ৬৬ টাকা, পাকিস্তানি মুরগির ডিম ৪০ টাকা এবং কোয়েলের ডিম ১২ টাকা বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শেখ কুদ্দুস আলী বলেন, ডিমের উৎপাদন ও সরবরাহ বেড়েছে। তবে দীর্ঘদিন এ দামে বিক্রি হলে খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
বারান্দী নাথপাড়ার বাসিন্দা তারেক আহমেদ বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় ডিমের দাম কমেছে। শুক্রবার এক খাঁচা ডিম কিনেছেন ২৭০ টাকায়।
মুরগির বাজারেও দাম কমেছে। বর্তমানে ব্রয়লার প্রতি কেজি ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা, লেয়ার ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ২৮০ থেকে ২৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফ্রেশ ব্রয়লার পয়েন্টের স্বত্বাধিকারী জসিম উদ্দিন রতন বলেন, সব ধরনের মুরগির দাম ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। এতে বিক্রিও বেড়েছে।
তবে গরু ও খাসির মাংসের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। গরুর মাংস প্রতি কেজি ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বাবুঘাট কাঠেরপুলের রাজ বিফ হাউজের স্বত্বাধিকারীরা আব্দুল কাদের ও পিটারসন রোড চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ী শওকত আলী বলেন, হাটে বা গৃহস্থের বাড়িতে যেখান থেকেই গরু কেনা হোক তা বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। গো খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করলে গরুর দাম স্থিতিশীল থাকবে বলে মনে করি।
বিমান অফিস মোড়, পুরাতন কসবার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম টগর বলেন, গরুর মাংসের দাম ৭৭০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। গরুর মাংস ৬০০ টাকা কেজি হলে ভালো হয়।
বাবুঘাট কাঠেরপুলের বাসিন্দা তানিয়া বেগম বলেন, সারা বছর মাছের গায়ে আগুন লেগে থাকে। তাই আমরা ব্রয়লার মুরগি খেয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাই।
মাছের বাজারেও কমতির প্রবণতা
মাছের বাজারে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের দাম কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে পাঙাশ প্রতি কেজি ১৭০ থেকে ২১০ টাকা, নাইলোটিকা ১৬০ থেকে ২২০ টাকা, রুই ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা, কাতলা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং পাবদা ৩০০ থেকে ৩২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া দেশি টেংরা ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা, শোল ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, শিং ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, বাগদা চিংড়ি ৮৫০ টাকা এবং গলদা চিংড়ি ৯৫০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মাছ বিক্রেতা অনিল বিশ্বাস বলেন, চলতি বছরের মধ্যে শুক্রবার বাজারে বিভিন্ন ধরনের মাছের দাম তুলনামূলকভাবে কম ছিল। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ থাকায় দাম কমেছে। বেজপাড়া এলাকার স্কুলশিক্ষক কাজী নওশাদ শাহরিয়ার বলেন, অনেক দিন পর মাছের দাম কমতে দেখলেন। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য এটি স্বস্তির খবর।
মুদিপণ্যে স্থিতিশীলতা
এদিকে চাল, ডাল ও ভোজ্য তেলের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন নেই। বর্তমানে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি কেজি ২০৭ থেকে ২২০ টাকা, সরিষার তেল ২২০ থেকে ২৪০ টাকা, পাম তেল ১৮৬ থেকে ১৯০ টাকা এবং সুপার তেল ১৯৩ থেকে ১৯৮ টাকা বিক্রি হচ্ছে। মসুর ডাল ৯০ থেকে ১৬০ টাকা, ছোলার ডাল ১১০ থেকে ১২০ টাকা, মুগ ডাল ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা, সাদা চিনি ১১০ টাকা, পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, আলু ২৫ টাকা এবং রসুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
মুদিপণ্য ব্যবসায়ী শ্যামল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শ্যামল কুন্ডু বলেন, আমদানিনির্ভর গরম মসলার দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। পাশাপাশি বোতলজাত সয়াবিন তেল চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না।
চালের বাজারেও স্থিতিশীলতা রয়েছে। বর্তমানে নাজিরশাল প্রতি কেজি ৯২ থেকে ৯৪ টাকা, স্বর্ণা ৫০ থেকে ৫২ টাকা, মিনিকেট ৫৬ টাকা, সুপার মিনিকেট ৫৯ থেকে ৬১ টাকা, আটাশ ৫২ থেকে ৫৫ টাকা এবং বাসমতি ৭৬ থেকে ৮২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। চাল ব্যবসায়ী অভিজিৎ ভৌমিক বলেন, চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও বিক্রি তুলনামূলক কম। বাজার অস্থিতিশীল হলে ক্রেতারা আগাম বেশি চাল কেনেন।
সব মিলিয়ে শীতের আগমনে সবজি, ডিম, মুরগি ও মাছের বাজারে দাম কমার প্রবণতা সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে। তবে মাংস, এলপিজি গ্যাস ও কিছু আমদানিনির্ভর পণ্যের উচ্চমূল্য সেই স্বস্তিকে সীমিত করে রেখেছে।
